পরীক্ষার হলে তাড়াহুড়ো করে লেখার সময় হাতের তালুতে কালি লেগে খাতা নোংরা হওয়ার অভিজ্ঞতা সবারই আছে। জেল পেন বা ফাউন্টেন পেনের কালি শুকানোর আগেই হাত ঘষে গেলে পুরো পৃষ্ঠা লেপটে যায়। কিন্তু এই বিরক্তিকর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা ও আরবি লেখার দিক আলাদা হওয়ার গভীর রহস্য। যখন কেউ বাংলা বা ইংরেজি লেখেন, কলম চলে বাঁ থেকে ডানে। অন্যদিকে আরবি বা ফারসি লেখার সময় কলম ছোটে ডান থেকে বাঁয়ে। ভাষাগুলো কি ইচ্ছা করেই উল্টো পথে চলে? নাকি ডানহাতি ও বাঁহাতিদের কোনো গোপন কৌশল এর ভেতরে লুকিয়ে আছে? আসলে ভাষাগুলো কোনো নিয়ম ভাঙেনি, বরং হাজার বছরের পুরোনো বিজ্ঞান ও প্রাচীন কারিগরি প্রযুক্তিকে অনুসরণ করেছে।
পাথর খোদাইয়ের যুগেই এই রহস্যের সূত্রপাত। আড়াই হাজার বছর আগে মানুষ পাথরের গায়ে হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করত। মধ্যপ্রাচ্যের আরবি, ফারসি বা হিব্রুর মতো লিপিগুলো সেই পাথরের বুকেই জন্ম নেয়। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ ডানহাতি হওয়ায় প্রাচীন কারিগর যখন পাথরে খোদাই করতেন, তাঁর বাঁ হাতে থাকত ছেনি, ডান হাতে ভারী হাতুড়ি। বাঁ হাতে ছেনি ধরে ডান হাতে হাতুড়ি পেটাতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ডান থেকে বাঁয়ে যাওয়া সবচেয়ে সহজ। কারণ, বাঁ দিক থেকে শুরু করলে কারিগরের বাঁ হাত দৃষ্টি আটকে দিত এবং হাতুড়ির ঘা ফস্কে গিয়ে বাঁ হাতে লাগার ভয় থাকত। তাই ডান থেকে বাঁয়ে খোদাই করাই ছিল নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়। ফিনিশীয় বা আরামাইক লিপি থেকে শুরু করে আজকের আরবি লিপি সেই ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে।
পাথর খোদাইয়ের যুগ পেরিয়ে মানুষ যখন প্যাপিরাস, গাছের পাতা, পশুর চামড়া আর কালি ব্যবহার শুরু করে, তখন নতুন সমস্যা দেখা দেয়। ডানহাতি ব্যক্তি কালিতে পালক বা কলম ডুবিয়ে ডান থেকে বাঁয়ে লিখতে গেলে হাতের তালু ঘষে সদ্য লেখা কাঁচা কালি লেপটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিজে একবার ডান হাত দিয়ে ডান থেকে বাঁয়ে লিখলে দেখা যাবে, হাতের ঘষায় পুরো খাতা নোংরা হয়ে যাচ্ছে। এই কালি লেপটে যাওয়া ঠেকাতেই গ্রিক, লাতিন এবং উপমহাদেশের লিপিগুলো দিক পরিবর্তন করে বাঁ থেকে ডানে লেখা শুরু করে। এতে হাতের তালু সব সময় লেখার সামনের ফাঁকা জায়গায় থাকে, কালি শুকানোর যথেষ্ট সময় পায় এবং লেখা পরিচ্ছন্ন থাকে।
প্রাচীন গ্রিকদের লেখার পদ্ধতি ছিল আরও অদ্ভুত। তারা প্রথম লাইন বাঁ থেকে ডানে লিখে, দ্বিতীয় লাইন ঠিক নিচে ডান থেকে বাঁয়ে লিখত—ষাঁড়ের হালচাষের মতো, যা 'বউস্ট্রোফেডন' নামে পরিচিত। তবে পরে তারা পুরোপুরি বাঁ থেকে ডানে লেখার নিয়ম গ্রহণ করে। অন্যদিকে প্রাচীন চীনা ও জাপানি ভাষায় লেখা হয় ওপর থেকে নিচে। কারণ, তারা বাঁশের কঞ্চির তুলি ব্যবহার করত। তুলি সোজা ধরে ওপর থেকে নিচে লিখলে হাতের সঙ্গে কাগজের ঘষা লাগার ভয় থাকে না। বাঁশ লম্বা হওয়ায় এই দিকেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।
এভাবে প্রতিটি ভাষার লেখার দিক নির্ধারিত হয়েছে লেখার উপকরণ ও প্রাচীন কারিগরি সুবিধার ভিত্তিতে। আরবি ও বাংলা কোনোটা ইচ্ছা করে উল্টো পথে লেখা শুরু করেনি। পাথরের কারিগরদের হাতিয়ার আরবিকে দিয়েছে ডান থেকে বাঁয়ের চল, আর কালির কলমের ব্যবহার বাংলাকে এনেছে বাঁ থেকে ডানের নিয়ম। আজও সেই ঐতিহ্য বহমান, যা ভাষার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।




