রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার মধুবাগ থেকে মীরবাগের দিকে অটোরিকশার ভিড়ে প্যাডেলচালিত রিকশা নিয়ে মগবাজারের পথে এগিয়ে যান বকুল আলী। সাদা চুল আর বুক পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা সাদা দাড়ির এই বৃদ্ধের বয়স ৭৭ বছর। পরনে মলিন একটি বাদামি শার্ট, যার বুকপকেটের ওপরের অংশটি খানিক ছেঁড়া। তবে চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও তাঁর মনে এখনো প্রবল ইচ্ছাশক্তি বিদ্যমান। রংপুর জেলার পীরগঞ্জে তাঁর আদি বাড়ি।
এই প্রৌঢ় বয়সে রিকশার মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ করার কারণ হিসেবে বকুল আলী জানান, তিনি কেবল এই কাজটাই পারেন। অন্যের কাছে হাত পেতে সাহায্য চাওয়ার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালানোকেই তিনি শ্রেয় মনে করেন। আল্লাহ যতটুকু আয় করান, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট এবং কৃতজ্ঞ।
বকুল আলীর দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাব বেশ জটিল। রিকশা মালিককে প্রতিদিন ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এছাড়া মেসে থাকা এবং দুবেলা খাবারের জন্য খরচ হয় ২০০ টাকা। সকালের নাশতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় ৫০ টাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ, দিনে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ টাকা আয় না হলে তাঁর সংসার চালানো অসম্ভব। সাধারণত দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হলেও সব সময় তা সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ, একদিন বিকেলে তাঁর আলাপকালে দেখা যায়, সকালে একজন যাত্রী থেকে ৯০ টাকা পেলেও রিকশার কলকবজা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আয় তেমন বাড়েনি। যদিও মেরামতের খরচ মালিক বহন করেন, তবে সময় নষ্ট হওয়ায় আয় কমে যায়।
বর্তমান সময়ে অটোরিকশার আধিক্যের কারণে প্যাডেলচালিত রিকশায় যাত্রী কমেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিশেষ করে বৃদ্ধ রিকশাচালকদের যাত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে এসেছে। তবুও তিনি অটোরিকশা চালান না, কারণ পুলিশি ঝামেলা এবং বড় অঙ্কের জরিমানার ভয় তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তাঁর মতে, ২০০ টাকা উপার্জনের আশায় ১২০০ টাকা জরিমানা দেওয়ার ঝুঁকি তিনি নিতে পারেন না।
পাকিস্তান আমলে কৈশোরে ঢাকায় আসা বকুল আলী দীর্ঘকাল ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। তাঁর স্মৃতিতে একসময় যে পথে ভাড়া ছিল এক টাকা, এখন সেখানে ভাড়া ২০-২৫ টাকা। ভাড়া বাড়লেও জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেশি বেড়েছে। তাই তিনি একটানা ১৫-২০ দিন ঢাকায় রিকশা চালান এবং পাঁচ-ছয় হাজার টাকা জমিয়ে গ্রামে ফিরে যান। সেখানে তাঁর দুই বিঘা পতিত জমি থাকলেও তেমন ফসল হয় না, তাই টাকা ফুরালে তিনি আবারও ঢাকায় ফিরে আসেন।
পারিবারিক জীবনে বকুল আলীর অভিজ্ঞতা বেশ বেদনাদায়ক। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং ছেলেরা আলাদা সংসার শুরু করেছে। বড় ছেলে ঢাকায় থাকলেও বাবার সাথে তাঁর যোগাযোগ নেই বললেই চলে। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী থাকলেও ছেলেদের উদাসীনতা তাঁকে ব্যথিত করে। অভিমানী কণ্ঠে তিনি জানান, ছেলেরা এখন বলে, 'বড় করেছ, এখন আমাদের জীবন আমাদের'। শরীরের জরা এবং পেশার অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের খরচ নিজেই চালানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই বৃদ্ধ রিকশাচালক।




