দুধ দিয়ে তৈরি চা, যা স্থানীয়ভাবে 'ছাই' নামে পরিচিত, কেনিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠান, সবখানে এই চা পরিবেশন করা হয়। অনেকেই দিনে বেশ কয়েকবার এই গরম পানীয়টি পান করেন। কিন্তু সম্প্রতি দেশটিতে দুধের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় চা প্রেমীদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সুপারমার্কেটগুলোর ফ্রিজের তাক প্রায় খালি, দাম বেড়ে গেছে, আর ক্রেতারা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দুধ কিনতে পারছেন না।
কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে একটি রেস্তোরাঁ চালান মুথোনি মাচারিয়া। প্রতিদিন তিনি ৭০ প্যাকেটের বেশি তাজা দুধ কেনেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি দুধ পাচ্ছেন না। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তিনি প্রশ্ন করেন, 'দুধটা কোথায় গেল?' তাঁর নিয়মিত গ্রাহকরা চা ছাড়া নাস্তা করতে চান না। কেউ কেউ কালো চা পান করছেন, তবে বেশিরভাগই তা পছন্দ করছেন না। মাচারিয়া বলেন, 'যদি কেউ দল বেঁধে আসে আর দুধ-চা না পায়, তাহলে তো আমার ব্যবসায় লস।'
কেনিয়া আফ্রিকার অন্যতম প্রধান দুধ উৎপাদনকারী দেশ। বাণিজ্যিক দুগ্ধ শিল্পের কারণে পাস্তুরিত দুধ শহরাঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়। আফ্রিকার মধ্যে কেনিয়ার মানুষের দুধ খাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি বলে শিল্প তথ্যে জানা গেছে। গ্রামাঞ্চলে কাঁচা ও টক দুধ বেশি পান করা হয়। তবে সম্প্রতি সংকটের কারণে দেশটির দুগ্ধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই 'সরবরাহ ঘাটতি' এবং 'কম মজুদ' এর কথা স্বীকার করেছে।
কেনিয়া ডেইরি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে প্রসেসরগুলিতে আনুষ্ঠানিক দুধ সরবরাহ ছিল ৮৪.৪ মিলিয়ন লিটার, যা জুলাইয়ে ৮১.৩ মিলিয়ন লিটারে নেমে আসে — ৩.৭ শতাংশ হ্রাস। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, আগস্টে সরবরাহ আরও কমেছে। কেনিয়া কনজিউমার ফেডারেশনের মতে, বছরের শুরু থেকেই দুধ সরবরাহের ধারা নিম্নমুখী। তারা এর জন্য ঋতুভিত্তিক বৃষ্টি বিলম্ব, চারণভূমি হ্রাস এবং পশুখাদ্যের দাম ৪৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করেছে।
এই সংগঠন দুধের দাম বৃদ্ধি ও রেশনিং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, তাজা দুধের দাম লিটারপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ কেনিয়ান শিলিং (০.৫৪ থেকে ০.৬২ ডলার) পর্যন্ত বেড়েছে। ফেডারেশনের অভিযোগ, এই ঘাটতি আগে থেকেই অনুমানযোগ্য ছিল এবং অনেকাংশে এড়ানো যেত। তারা বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রসেসর নিউ কেসিসি এবং ডেইরি বোর্ড গত বছর অতিরিক্ত দুধ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করেনি। অতিরিক্ত দুধ থেকে তৈরি গুঁড়ো দুধ যদি মজুদ রাখা হতো, তাহলে বর্তমান সংকট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব ছিল। অনেক প্রসেসর শুষ্ক মৌসুমে গুঁড়ো দুধকে তরল দুধে রূপান্তর করে থাকে।
ফেডারেশন কৃষকদের জন্য খাদ্য ও ভর্তুকি সহায়তার একটি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছে। পশুখাদ্যের ওপর কর মওকুফ এবং খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুযোগসুবিধা নেওয়া বন্ধের আহ্বানও জানানো হয়েছে। ডেইরি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইলিয়াম মারিতিম অবশ্য সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেছেন যে, 'সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি' সত্ত্বেও দুধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে স্বল্প মেয়াদে সংরক্ষণযোগ্য পাস্তুরিত দুধে প্রভাব বেশি পড়েছে বলে তিনি জানান।
নাইরোবির সুপারমার্কেটে দুধ খুঁজতে আসা ক্রেতারা দাম বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এক ক্রেতা বার্নার্ড আবোক বলেন, 'মাঝে মাঝে গিয়ে দেখি দুধ নেই। আবার পেলেও দাম বেড়ে গেছে। আজ এক দাম, কাল আবার বেড়ে যায়।' আরেক ক্রেতা প্যাট্রিসিয়া গাথোনি জানান, দাম বাড়তে থাকলে তিনি শিশুদের জন্য দুধ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দেবেন। তিনি ইতিমধ্যে কিনতে পাওয়া দুধে পানি মিশিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দুগ্ধ প্রসেসরদের সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে কৃষকদের সহায়তা, দুধ সরবরাহ স্থিতিশীলকরণ এবং ভোক্তাদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পশুসম্পদ উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা জোনাথন মুয়েকে বলেন, হলুদ ভুট্টার শুল্কমুক্ত আমদানিসহ কৃষকদের জন্য আরও খাদ্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুধের প্রাচুর্য ও ঘাটতির সময় স্থিতিশীলতা আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা হচ্ছে। অতিরিক্ত দুধ সংরক্ষণের জন্য একটি তহবিল গঠনের কথাও ভাবছে সরকার। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকে সাময়িকভাবে দুধ আমদানির পরিকল্পনা চলছে।
তবে কেনিয়ার চা প্রেমীদের জন্য এখনও কোনো নিশ্চিত সমাধান পাওয়া যায়নি। দুধ সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে তাদের প্রিয় পানীয়টি অনেকদিন বন্ধ রাখতে হতে পারে।




