বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে পেশাগত জীবন থেকে এই প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলা এখন প্রায় অসম্ভব। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই প্রযুক্তিকে কীভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বা আদৌ করানো হবে কি না, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যথেষ্ট দেরি করে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা যখন স্নাতক শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, ততদিনে এআই-এর ব্যবহার অনেক গভীরে পৌঁছে যাবে, কিন্তু তাদের একাডেমিক শিক্ষা হবে এর বিপরীত।

নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আমান্ডা কুলেনের অভিজ্ঞতা এই বৈপরীত্যেরই উদাহরণ। ২০৩০ সালে স্নাতক হতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীর অধিকাংশ ক্লাসেই এআই ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনেক অধ্যাপক স্পষ্টভাবে সিলেবাসে উল্লেখ করেছেন যে, যথাযথ উৎস উল্লেখ না করলে এআই ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কুলেনের মতে, যখন পেশাজীবীদের মাঝে এটি এত বেশি জনপ্রিয় এবং প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এটি শেখানো উচিত। সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার চেয়ে এর সঠিক ব্যবহার জানা বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বিভ্রান্তির মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ। প্রথমত, এই প্রযুক্তির উন্নতির গতি এতটাই তীব্র যে, একজন শিক্ষার্থীর চার বছরের স্নাতক কোর্স শেষ হওয়ার আগেই এআই-এর সংস্করণ ও কার্যকারিতা আমূল বদলে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘদিনের সমস্যা 'অ্যাসাইনমেন্টে নকল' করা এখন এআই-এর কারণে আরও সহজ হয়ে গেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোর্সের কাজে এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে বাধা দেয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ পেশার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

তবে কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এই পরিস্থিতির ভিন্ন সমাধান খুঁজছেন। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী লরেন ক্যালেন মনে করেন, নিষিদ্ধ করার চেয়ে দায়িত্বশীল ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরি করা বেশি কার্যকর। তিনি জানান, তার একটি পাইথন কোর্সে এআই-কে বাধা দেওয়ার বদলে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সাহায্য নিতে পারে, তবে তাদের প্রম্পট এবং এআই-এর উত্তরের ট্রান্সক্রিপ্ট জমা দিতে হয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো ক্যাম্পাসের জন্য কোনো একক নীতি না রেখে তারা অনুষদ সদস্যদের নিজস্ব কোর্সে এআই ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণের স্বাধীনতা দিয়েছেন।

সাউথ ক্যারোলাইনা ইউনিভার্সিটির ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাবরিনা হাবিব জানান, শুরুর দিকে অনেক শিক্ষকই এআই-এর বিরোধী ছিলেন কারণ তারা মনে করতেন এটি মৌলিক শিক্ষার পথে অন্তরায়। তবে বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষকই মেনে নিয়েছেন যে এটি কর্মজীবনের একটি অপরিহার্য দক্ষতা। তিনি তার শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের সুযোগ দেন, তবে শর্ত থাকে যে শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে সে কীভাবে এটি ব্যবহার করেছে এবং তার প্রমাণ দিতে হবে। হাবিবের মতে, এআই বর্জন করলে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও গঠনমূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, কিছু শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় এআই-এর ব্যবহার সীমিত রাখছেন। আমান্ডা কুলেনের মতো অনেকে মনে করেন, মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিকাশ হওয়া প্রয়োজন এবং আগে থেকে প্রোগ্রাম করা কোনো কম্পিউটারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। ফলে একদিকে প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে একাডেমিক সততা ও মৌলিক চিন্তার লড়াই এখন উচ্চশিক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।