মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর কানাডার আরোপিত পাল্টা শুল্ক মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ইস্পাত, আসবাবপত্র, তুলার টি-শার্টসহ প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের আমেরিকান পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করা হচ্ছে। তালিকায় তাজা মাছ ও লবস্টারও ছিল, তবে সীফুড শিল্পের তীব্র আপত্তির মুখে সেগুলো বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে অটোয়া। এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে নিজেদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় কানাডাকে কতটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

দুই দেশের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন যে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, তবে গত আগস্টের শেষ দিকে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে কোনো সংলাপ শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানান, কানাডা এখনও এমন একটি চুক্তি খুঁজছে যা 'টেকসই' হবে এবং দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে। তিনি বলেন, 'আমরা বসতে প্রস্তুত, এবং যখন আমেরিকানরা প্রস্তুত হবে তখন সেই চুক্তি সই করতে পারব।'

অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বৃহস্পতিবার বলেছেন, বল এখন কানাডার কোর্টে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, 'আমরা তাদের সেরা চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তারা তা সরাসরি দেখে ফিরিয়ে দিয়েছে।' তিনি যোগ করেন, আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর কানাডিয়ান পক্ষের সঙ্গে খুব কম যোগাযোগ হয়েছে। কানাডিয়ান ব্রডকাস্টার সিবিসিকে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু কানাডিয়ান পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।

এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার হুমকি দিয়েছেন, কানাডাভিত্তিক বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ার যদি তাদের উৎপাদন দক্ষিণে না সরায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সব ব্যবসা বন্ধ করে দেবে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোম্বার্ডিয়ার ২০২৪ সালে কানাডার বার্ষিক জিডিপিতে ৭ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি অবদান রেখেছে — পাবলিক অ্যাকাউন্টিং ফার্ম পিডব্লিউসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সপ্তাহজুড়ে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প কানাডার সমালোচনা করে একাধিক পোস্ট করেছেন, যার মধ্যে কানাডার বিনিময় হারকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি পোস্টে কানাডা, মেক্সিকো ও গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন পতাকায় আচ্ছাদিত উত্তর আমেরিকার মানচিত্র দেখানো হয়েছে।

২০২৫ সালে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার — বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সম্পর্ক। নতুন মার্কিন শুল্ক এবং কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ায় দুই পাশের ব্যবসায়ীরা এখন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কানাডিয়ান গাড়ি ও ট্রাকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, পাশাপাশি ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের ওপরও কর রয়েছে। গত আগস্টের শেষে দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহল, হকি স্টিক ও পারফিউমের মতো অন্যান্য পণ্যে নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসান ট্রাম্প।

কার্নি যাকে 'ডলার-ফর-ডলার' প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেই পাল্টা শুল্ক মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে শত শত আমেরিকান পণ্যের ওপর প্রয়োগ হচ্ছে। এর আগে কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ/সিউএসএমএ) অনুসরণ না করা আমেরিকান তৈরি গাড়ি ও ট্রাকের ওপরও কানাডার আগে থেকে আরোপিত শুল্ক রয়েছে।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, কানাডার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের পক্ষে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন এই পাল্টা শুল্ক পোশাক, খাদ্য ও আসবাবের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। কানাডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সও কার্নি সরকারকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট প্রতিশোধ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। চেম্বারের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী ক্যান্ডেস লেইং বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'ব্যবসায়ীরা প্রতিশোধ বোঝেন, কিন্তু তারা অবিরাম উত্তেজনা দেখতে চান না।' তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বাণিজ্য বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হবে জেনেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মৎস্য শিল্পের চাপের মুখেই কানাডা পাল্টা শুল্কের তালিকা থেকে কয়েক ডজন সীফুড পণ্য বাদ দিয়েছে, যাতে নিজেদের অর্থনীতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব না পড়ে। কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লবস্টার শিল্প দুটোই একে অপরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল — আমেরিকায় ধরা লবস্টার প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রায়ই কানাডায় পাঠানো হয়, এরপর তা আবার মার্কিন বাজারে ফেরত যায়।

সাম্প্রতিক শুল্কের আগে কানাডার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিস্থাপকতার লক্ষণ দেখিয়েছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি ৩.৩ শতাংশ বেড়েছিল এবং এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৮১ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আগস্টে প্রায় ৪১ হাজার চাকরি হারিয়েছে — যে সময়ে মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয় এবং বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ে। তবে উৎপাদন খাতে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা কানাডিয়ান সরকারের মতে, দেশীয় পণ্য কিনতে শুরু করায় ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহের কারণে।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি কানাডার বাণিজ্যকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বহুমুখী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জুলাইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কানাডিয়ান রপ্তানির অংশ ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে — বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে গড় ছিল ৭৫ শতাংশ।