মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্ক আরোপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। গত সপ্তাহান্তে কানাডিয়ান পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প, তারই প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার এ পদক্ষেপ নেয় অটোয়া।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেইনের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের আমেরিকান পণ্যের ওপর এই পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে। তালিকায় রয়েছে ইস্পাত, আসবাবপত্র, তাজা টুনা মাছ এবং সুতির তৈরি টি-শার্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পপণ্য। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন কানাডিয়ান পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসায়। সেই ঘোষণার প্রেক্ষাপটেই কানাডার এই পাল্টা পদক্ষেপ। অর্থমন্ত্রী শ্যাম্পেইন বলেন, “এই শুল্ক কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা এবং সারাদেশের জনগোষ্ঠীর ওপর বাস্তব প্রভাব ফেলবে। তাই কানাডাকে জবাব দিতেই হবে।” তিনি কানাডার এই পাল্টা ব্যবস্থাকে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ ও ‘কৌশলগত’ বলে অভিহিত করেছেন।
একইসাথে মার্কিন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শ্রমিকদের সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ৭.৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের একটি ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তিনি। এই অর্থ দিয়ে চাকরি ধরে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদার এই দুই দেশের মধ্যে শুল্ক যুদ্ধের ফলে সীমান্তের দুই পাশেই ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন বাড়তি বাণিজ্য খরচের চাপ পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে বড় এবং ছোট সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে।
এদিকে কানাডার সর্বশেষ পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একাধিক পোস্টে তিনি কানাডাকে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকানোর’ এবং আমেরিকান কৃষকদের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, “আমি অনেক দেশের সঙ্গে কাজ করি, আর কানাডা সহজেই সবচেয়ে কঠিন ও অযৌক্তিক। তারা নিজেদের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মনে করে, কিন্তু তারা কোনো অঙ্গরাজ্য নয় এবং আর সুবিধা পাবে না!”
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্তে অবস্থিত গ্রেট লেকের অন্যতম লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি, লিখেন, “আমরা অন্টারিওর সঙ্গে আর বেশি ব্যবসা করার আশা করছি না।” এর আগে সোমবার কানাডিয়ান অটোমোবাইলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দেন ট্রাম্প। জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেন, অটোমোবাইল উৎপাদন, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ কানাডার শিল্পখাতকে ‘ধ্বংস’ করতে চান ট্রাম্প।
সোমবার দুই পক্ষের বক্তব্যে উত্তেজনার পারদ চরমে উঠলেও মঙ্গলবার কিছু কর্মকর্তা কূটনৈতিক সুরে আলোচনা পুনরায় শুরুর আশা প্রকাশ করেছেন। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সোমবার ট্রাম্পকে ‘পরাজিত’ বললেও সিএনএনের এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, “পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তবে আমি একটি চুক্তি করতে চাই — আমেরিকান জনগণের জন্য ভালো চুক্তি এবং কানাডিয়ানদের জন্যও ভালো চুক্তি।”
এই উত্তেজনার মধ্যে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ)-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি আলোচনার জন্য তার অর্থনীতি সচিব মার্সেলো এব্রার্ডকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। কানাডা মঙ্গলবার প্রায় ৭০০টি মার্কিন পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে যেগুলোর ওপর পাল্টা শুল্ক বসানো হবে।




