বিদেশি কর্মী নিয়োগে ইচ্ছুক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন করে বিপুল অঙ্কের ফি প্রস্তাব করেছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট (ডিএইচএস)। চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার সংস্থাটি জানিয়েছে, এইচ-১বি ভিসার বিদ্যমান আবেদন ফি ছাড়াও নিয়োগকর্তাদের অতিরিক্ত ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার গুনতে হবে। ফেডারেল আদালতের বিচারক ছয় মাস আগে এই ধরনের ছয় অঙ্কের ফি প্রস্তাব বাতিল করার পরই নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।
নিজস্ব বিশ্লেষণে ডিএইচএস জানিয়েছে, এই অতিরিক্ত ফি চালু হলে ১১ হাজার ৫১টি ছোট প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ তারা যে পরিমাণ ছোট ব্যবসা বিশ্লেষণ করেছে তার ৭৬ শতাংশই, এর ফলে 'উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাবের' মুখোমুখি হবে। ৩০ দিনের জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষে প্রস্তাবটি কার্যকর হলে প্রযুক্তি কোম্পানি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপগুলোর জন্য ভিসা কর্মসূচির খরচ নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে। পাশাপাশি, এই পদক্ষেপ বড় কোম্পানিগুলোকে ছোট প্রতিযোগীদের তুলনায় আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডিএইচএসের যুক্তি হলো, এই ফি কোম্পানিগুলোকে বিদেশি কর্মীর বদলে বেশি সংখ্যক মার্কিন নাগরিক নিয়োগে উৎসাহিত করবে। তবে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ব্রিটা গ্লেনন বলছেন, এইচ-১বি ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গবেষণা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। অভিবাসন ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা এই গবেষক ফরচুনকে বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যখন এইচ-১বি ভিসা পায় না, তখন তারা বিদেশে নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান খোলার বা সেখানে নিয়োগ বাড়ানোর পথ বেছে নেয়। অর্থাৎ তারা কাজ বিদেশে সরিয়ে নেয়।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিকল্প থাকলেও স্টার্টআপদের জন্য সেই সুযোগ নেই। গ্লেনন গবেষণার উল্লেখ করে বলেন, যে স্টার্টআপগুলো প্রত্যাশিত এইচ-১বি কর্মীদের পায় না, তাদের পেটেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সফলভাবে অধিগ্রহণ বা আইপিওতে পৌঁছানোর হারও কম। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এই সমস্যা মোকাবিলার 'উপায় থাকে'। ছোট কোম্পানিগুলোর বিকল্প কম, তাই এই ফি সরাসরি তাদের মুনাফা ও সাফল্যে আঘাত হানবে, বিশেষত স্টার্টআপদের জন্য কর্মীই তাদের সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি।
গত বছরও বিদেশি কর্মীদের জন্য ছয় অঙ্কের ফি আদায়ের চেষ্টা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় নির্দিষ্ট কিছু এইচ-১বি কর্মীর জন্য ১ লাখ ডলার প্রদানের নির্দেশ দেন। তবে জুনে জেলা বিচারক লিও সোরোকিন সেটি বাতিল করেন। প্রশাসন আপিল করলেও গত মাসে ফার্স্ট সার্কিট আপিলের সময় ফি আদায় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। এবার ডিএইচএস তাদের ফি নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রচলিত নোটিশ ও মন্তব্যের প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবটি এনেছে। অভিবাসন আইনজীবী এলিজাবেথ রিক্কির মতে, এই প্রক্রিয়া নতুন ফি নীতিটিকে 'প্রত্যাশিত আইনি লড়াই টিকে থাকার আরও ভালো সুযোগ' দেবে।
এই ফি মূলত অভিবাসন সংক্রান্ত ব্যয় পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে। ডিএইচএস জানিয়েছে, অভিবাসন-সংক্রান্ত খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮.৮ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ককে বছরে ৮৫ হাজার এইচ-১বি ভিসা দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার। তবে এই নিয়ম কার্যকর হলে ১০ বছরে নিয়োগকর্তাদের ওপর ৭৪.৯ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক বোঝা চাপবে। ডিএইচএসের ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার ফরচুনকে বলেন, প্রস্তাবিত এই ফি বৈধ অভিবাসন কর্মসূচি পরিচালনা ও তদারকিতে ফেডারেল সরকারের ব্যয় পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে, যা অন্যথায় করদাতাদের অর্থে চালাতে হতো।
কিন্তু রিক্কি মনে করেন, ডিএইচএসের এই হিসাব পরস্পরবিরোধী। কারণ, ফির কারণে ভিসার আবেদন কমলে সরকার সেই অর্থ পাবে না। তিনি বলেন, এই ফি কর্মীদের নিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে এই যুক্তিতে যদি সেটা সত্যি হয়, তাহলে ৮.৮ বিলিয়ন ডলার আদায় হবে না। আর কোম্পানিগুলো ফি দিয়েই কর্মী নিয়োগ করলে, তাহলে ফিটি নিরুৎসাহক হিসেবে ব্যর্থ। 'দেশ যেভাবেই হোক দক্ষ কর্মী ও কর্মসংস্থান হারাবে,' মন্তব্য করেন তিনি।
ডিএইচএস অবশ্য আশা করছে, অতিরিক্ত ফি সত্ত্বেও চাহিদা এতটাই বেশি থাকবে যে ৮৫ হাজার এইচ-১বি ভিসার সবগুলোই পূরণ হবে। গ্লেনন বলছেন, প্রথম দিকে এমনটা হতে পারে, কারণ এই কর্মসূচিতে ঐতিহাসিকভাবেই আবেদনের পরিমাণ অনেক বেশি। তবে ভিসা পাওয়া কর্মীদের ধরন বদলে যাবে। তার মতে, এন্ট্রি-লেভেলের কর্মীদের জন্য আর কোনো সুযোগ থাকবে না। বদলে স্পনসরশিপে প্রাধান্য পাবে অভিজ্ঞ কর্মী এবং 'যেসব সত্যিকারের বড় কোম্পানি এই খরচ বহন করতে পারবে', যার ফলে ছোট কোম্পানি ও স্টার্টআপরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়তে পারে। এইচ-১বি ভিসা শেষমেশ পাওয়া যাবে না বলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা মার্কিন ডিগ্রি নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। গ্লেনন বলেন, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেমন বড় প্রভাব পড়বে, তেমনি কোম্পানিগুলোর ওপরও পড়বে, কারণ এই পথটি তাদের প্রতিভা আনার একটি বড় উৎস।




