যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দৃশ্যত স্থিতিশীল মনে হলেও এর গভীরে বড় ধরনের ঝুঁকি লুকিয়ে আছে বলে মনে করছে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি প্রকাশিত ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিজনেস (NFIB)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিক্রয় হ্রাস। বেসপোক ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের মতে, অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিক্রয় কমে যাওয়াকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হয়। আগস্টে ৯৮.৭ থেকে নেমে সেপ্টেম্বরে এনএফআইবি সূচক ৯৭.৯-এ দাঁড়িয়েছে। প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের গবেষক স্যামুয়েল টম্বস এবং অলিভার অ্যালেন মনে করেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে তৃতীয় প্রান্তিকের শেষে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা স্তিমিত হয়েছে।
মুডিজ অ্যানালিটিকসের মার্ক জান্ডি মার্কিন শ্রমবাজারের বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতের বাইরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। তিনি জানান, গত এক বছরে মাসিক পে-রোল প্রবৃদ্ধি গড়ে মাত্র ৪০ হাজারে নেমে এসেছে। একদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে অবসরগ্রহণ এবং অভিবাসন হ্রাসের কারণে বেকারত্বের হার কম মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে। এছাড়া ফেডারেল রিজার্ভ এবং বন্ড মার্কেটের উচ্চ সুদের হারের চাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতের মূলধনী বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জান্ডির সতর্কবার্তা, উচ্চ সুদের হার দীর্ঘস্থায়ী হলে এআই খাতটি অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল অংশে পরিণত হয়ে ভেঙে পড়তে পারে।
মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সেপ্টেম্বরে কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (CPI) ৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত মাসের ৩.৪ শতাংশের তুলনায় বেশি এবং প্রত্যাশার চেয়েও উচ্চ। হ্যারিস ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের জেমি কক্স মনে করেন, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুটি যুদ্ধের প্রভাব দূর না হওয়া পর্যন্ত এই মুদ্রাস্ফীতি থামবে না। পিমকো-র টিফানি ওয়াইল্ডিং জানান, মুদ্রাস্ফীতির এই তথ্যের পর অক্টোবর মাসে ফেডারেল রিজার্ভ পুনরায় সুদের হার বাড়াতে পারে বলে বাজারের সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশ।
এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রয় চাপ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি (KOSPI) সূচক ৮ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ায় এক পর্যায়ে লেনদেন বন্ধ রাখতে হয়। নাসডাক ফিউচারসও নিম্নমুখী হয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে নিউ ইয়র্ক বাজার খুললে এই দরপতন অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম কমেছে। তবে এই মন্দার মধ্যেও অ্যাপল ৫ ট্রিলিয়ন ডলার মার্কেট ক্যাপ স্পর্শ করে নতুন রেকর্ড গড়েছে এবং টিএসএমসি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ত্রৈমাসিক ফলাফল দেখিয়েছে।
অস্থিরতা ছড়িয়েছে বন্ড মার্কেটেও। মার্কিন ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৫.৩২ শতাংশে পৌঁছে পরে ৫.০৮ শতাংশে নেমে আসে, যা এই সম্পদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ওঠানামা। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে এবং বিটকয়েনের দাম কমে ৮১,২৬৫ ডলারে নেমে এসেছে। এশিয়ার বাজারে জাপানের নিক্কেই ২২৫ ৪.৯০ শতাংশ এবং চীনের সিএসআই ৩০০ ১.২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তবে ভারতের নিফটি ৫০ সূচক ১.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।




