যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় যে কোনো প্রতিবেশী দেশ জড়িয়ে পড়লে তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে — এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বার্তা দেন। তিনি বলেন, সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে; অন্যথায় তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে চলার প্রেক্ষাপটে রেজাইয়ের এই মন্তব্য এলো। এর আগে বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তাঁর সরকার ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, যখন দুই মিত্র দেশ যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফা হামলা চালায়।

চলতি সপ্তাহে ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প আরও একটি নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ বা সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র সম্মুখীন হতে হবে। ট্রাম্পের এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য দেশগুলোর এখন দুটো পথ খোলা — হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা, না হয় তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

রেজাই তাঁর সাক্ষাৎকারে ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, প্রথম পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে, দ্বিতীয় পর্যায়ে কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা চালানো হবে। কারণ, ইরান আসলে যুদ্ধ বিস্তার করতে চায় না। তবে তৃতীয় পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষাবলম্বনকারী দেশগুলো যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইরানের এই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সংকটের ফলে রাস্তায় বিক্ষোভ দেখা দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কার্যক্রমকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে।

গত ১৭ জুনের একটি সমঝোতা স্মারক ব্যর্থ হওয়ার পর যুদ্ধবিরতির আলোচনা কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে। ওই সমঝোতায় ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ বিদ্যমান। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেল ও সারের মতো জরুরি পণ্যের দাম ব্যাপক বেড়ে যায়, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে বাধ্য হয়।

তেহরান এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

এদিকে, মার্কিন এই নতুন নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন অবরোধের মুখে ইরানকে একঘরে করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা যে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশগুলোর অবস্থানের কারণে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, সে বিষয়টিও বিশ্লেষকরা তুলে ধরছেন।