দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নির্মাণ খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগের অভাব, বাজারের চাহিদা হ্রাস এবং বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রড, সিমেন্ট, কাচ ও সিরামিক টাইলসের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই জ্বালানি ঘাটতির ফলে অনেক কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের সূত্রপাত হয় গত ২১ জুলাই, যখন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের দায়িত্বে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে শিল্পকারখানাগুলো তীব্র গ্যাসের অভাব অনুভব করছে। সামিটের টার্মিনাল থেকেও মাঝে মাঝে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। যদিও আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে টার্মিনালগুলো আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়, কিন্তু কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেটের সরবরাহ পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। ২২ আগস্ট থেকে কিছু এলাকায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়।

তদন্তে দেখা গেছে, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাচ ও সিরামিক শিল্প, এরপরই রয়েছে রড ও সিমেন্ট খাত। লোডশেডিংয়ের প্রভাব সব খাতেই বিদ্যমান। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ইস্পাত কারখানা রয়েছে যাদের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা এক কোটি টনের বেশি, যদিও জাতীয় চাহিদা ৬৫ থেকে ৭৫ লাখ টনের মধ্যে। শাহরিয়ার স্টিল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাসাদুল আলম জানান, সরকারি উন্নয়ন কাজ কমে যাওয়ায় রডের চাহিদা আগে থেকেই হ্রাস পেয়েছিল, আর এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৪০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি সতর্ক করেছেন যে, আসন্ন নির্মাণ মৌসুমে উৎপাদন না বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সিরামিক খাতের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ভোলা ও হবিগঞ্জ বাদে প্রায় সব এলাকার সিরামিক কারখানা সংকটে ভুগছে। আকিজ সিরামিকসের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, জ্বালানির অপর্যাপ্ত চাপের কারণে পণ্যের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে, মীর সিরামিকসের একটি ইউনিট দীর্ঘ ১৭ দিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি চালু হয়েছে, তবে গ্যাসের চাপের অভাবে তাদের চার ইউনিটের মধ্যে একটির বেশি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সমাধান না হলে আর্থিক মন্দার পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, ফলে টাইলসের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং বাড়ি নির্মাণের খরচ বেড়ে যাবে।

সিমেন্ট খাতের অবস্থাও প্রায় একই। দেশে ৩৫ থেকে ৪০টি সিমেন্ট কোম্পানি থাকলেও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, বিকল্প জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ে কারখানা চালানো হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল। এছাড়া গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে যাওয়ায় দামি যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঘনঘন জেনারেটর ব্যবহারের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রবাসী আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির কারণে খাতটি কোনোমতে টিকে আছে। প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রস্তাব করেন, রেশনিং পদ্ধতিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করলে সকল স্তরে উৎপাদন পুনরায় সচল করা সম্ভব হবে।