কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের সংকট দূর করতে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন সৈয়দ জুবায়ের হাসান। প্রথম আলো ডটকম এবং প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-৩’-এ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় এই আলোচনায় জুবায়ের হাসান জানান, কৃষকের আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেকে এই পেশা ছেড়ে শহরের রিকশাচালকের মতো কাজে ঝুঁকছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করা জুবায়ের হাসানের পারিবারিক ব্যবসার সাথে কৃষি খাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০১৯ সালে পড়াশোনার চলাকালীন তিনি লক্ষ্য করেন, কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করেও পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা রাখেন না; বরং মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা দাম নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সমস্যাটিকে তিনি কেবল সংকট হিসেবে না দেখে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল কৃষকেরা যেন কেবল ন্যায্য দাম নয়, বরং পণ্যের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য মূল্য পান।
প্রযুক্তির জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি কৃষি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে ব্লকচেইন ভিত্তিক একটি মডেল তৈরি করেন। তবে শুরুর দিকে তিনি এক বড় ধাক্কার সম্মুখীন হন। জুবায়ের হাসান জানান, প্রযুক্তিগতভাবে সমাধান তৈরি করলেও প্রান্তিক কৃষকরা সেই সময়ে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি 'ব্যর্থতা' হিসেবে অভিহিত করলেও মনে করেন, এখান থেকেই তিনি সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল প্রযুক্তি তৈরি করলেই চলে না, বরং ব্যবহারকারীর বাস্তব প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বুঝে সমাধান নকশা করতে হয়।
বর্তমানে 'কৃষি স্বপ্ন' নেটওয়ার্কের আওতায় ২০ হাজারেরও বেশি কৃষি উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী কৃষকদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারা কৃষকদের দুটি পর্যায়ে সহায়তা প্রদান করে: ফসল কাটার আগে প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ ও সার প্রদান এবং ফসল কাটার পর মোড়কজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাছাইকরণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। জুবায়ের হাসানের মতে, বাজারদরের চেয়ে সামান্য কিছু টাকা বেশি দিতে পারলেও তা একজন কৃষকের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
নিজের অর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক মূল্যায়নের চেয়ে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা এবং ১৯ সদস্যের একটি নিবেদিত দল গঠন করা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য। আলোচনার শেষ অংশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, বন্যা ও মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার কারণে কৃষকরা প্রতি বছর ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এর সমাধানে তিনি জলবায়ু তহবিল এবং কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার কথা বলেন। তাঁর বিশ্বাস, উন্নত কৃষি পদ্ধতি অনুসরণের বিনিময়ে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা সম্ভব, যা কৃষিকে আরও টেকসই করবে।




