জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে একটি কাচের বাক্সে সংরক্ষিত আছে ফারসি ভাষায় লেখা একটি প্রাচীন কাবিননামা। এটি তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী এবং মুকিমপুরের সৈয়দ নেজাবত আলী চৌধুরীর কন্যা আফসারুন নেসা খাতুনের বিয়ের দলিল। ইতিহাসবিদ ও লেখক সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর এই মূল্যবান দলিলটি জাদুঘরকে উপহার দিয়েছিলেন।
দলিলটির অনুবাদে জানা যায়, বিয়ের আগে আফসারুন নেসা খাতুন তিনটি বিশেষ শর্ত দিয়েছিলেন। প্রথমত, বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, স্বামী একটানা ছয় মাসের বেশি স্ত্রীকে ছেড়ে থাকতে পারবেন না। তৃতীয়ত, স্ত্রীর কোনো ভুল হলে স্বামী তাকে মারধর করতে পারবেন, তবে শর্ত থাকে যে শরীরে কোনো দাগ ফেলা যাবে না। জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী এই সব শর্ত মেনে নিয়ে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছিলেন। এছাড়া এই বিয়ের দেনমোহর হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং ৫০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা।
দলিলটির সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিক অসংগতি দেখা দিয়েছে। জাদুঘরের নথিতে ১৯২৩ সাল লেখা থাকলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান মুমিত আল রশিদ মনে করেন এটি ১৮২৩ সালের। তিনি দলিলের নিচের অংশে থাকা হিজরি সালের উল্লেখ এবং ইরানের ও সিরিয়ার বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁর মতে, ১২০০ হিজরি সালের উল্লেখ থাকলে এটি ১৯২৩ সালের হওয়ার সম্ভাবনা নেই, বরং ১৮২৩ সালের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনিসুর রহমান জানান, সে সময়ে অভিজাত ও বিত্তশালী মুসলিম পরিবারগুলোতে এমন লিখিত চুক্তির প্রচলন ছিল। বিশেষ করে জমিদারদের একাধিক বিয়ে ও উপপত্নী রাখার প্রথার কারণে প্রথম স্ত্রীর দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের শর্তযুক্ত কাবিননামা করা হতো। বর্তমানে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইনের আওতায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর কাবিননামা প্রচলিত থাকলেও, তৎকালীন সময়ে এটি ছিল অনেকটা ব্যক্তিগত চুক্তির মতো।
অনুরূপ আরেকটি শর্তযুক্ত কাবিননামার উদাহরণ পাওয়া যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে। ১৮২৬ সালের সেই দলিলে ফতেহাবাদের মীর খানের সঙ্গে লুতফুন নিসার বিয়ের কথা উল্লেখ আছে। সেখানে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি, দূর প্রবাসে যাওয়া, দেনমোহর বুঝিয়ে দেওয়া এবং আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করার অধিকারের মতো চারটি শর্ত রাখা হয়েছিল।
জাতীয় জাদুঘরের এই সংগ্রহটি কেবল একটি বিয়ের নথি নয়, বরং তৎকালীন সময়ে একজন নারীর নিজের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লড়াইয়ের এক নীরব সাক্ষী। যদিও ফারসি লেখাগুলো অস্পষ্ট এবং সংগ্রহের সঠিক তারিখ জাদুঘরের পুরনো রেজিস্টারে নেই, তবুও এই দলিলটি দর্শকদের মাঝে প্রবল কৌতূহল সৃষ্টি করে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, বিয়ের আগে নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা কেবল বর্তমান যুগের বিষয় নয়, বরং তা বহু প্রাচীন।




