নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এক কড়া ভাষণে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান সংঘাতের সমাধান না হলে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে 'নিঃশেষ' (annihilate) করতে পারেন। ইরানের প্রতিনিধি দলের মাত্র একজন সদস্য যখন তার ভাষণ শুনছিলেন, তখন ট্রাম্প জানান, তিনি এখন একটি বড় সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে—হয় ইরানের সাথে শান্তি চুক্তি করবেন, নয়তো পুনরায় সামরিক অভিযান চালাবেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য তার 'জোরপূর্বক কূটনীতি' কৌশলেরই অংশ, যেখানে তিনি একদিকে চরম শক্তির হুমকি দেন এবং অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখেন। তিনি মনে করেন, এই সংঘাতের কারণেই তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারেনি এবং এটি তার 'শক্তির মাধ্যমে শান্তি' দর্শনের প্রমাণ। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, নভেম্বর মাসে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। এই কড়া হুঁশিয়ারির মধ্যেই পর্দার আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে ইরানি প্রতিনিধি দলের তিন ঘণ্টার একটি 'ফলপ্রসূ' বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের এই সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
ইরান ছাড়াও ট্রাম্পের ভাষণে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। তিনি দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে তিনি খুব দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। এআই-এর ক্ষেত্রে তিনি চীনকে পেছনে ফেলে মার্কিন নেতৃত্ব ধরে রাখার অঙ্গীকার করেন এবং 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দটির বদলে একে 'সুপার ইন্টেলিজেন্স' হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, 'আর্টিফিশিয়াল' শব্দটি বিষয়টিকে কৃত্রিম বা নকল হিসেবে উপস্থাপন করে, যা আসলে বিস্ময়কর এক প্রযুক্তি।
আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতি তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প 'বিশ্ব সরকার'-এর ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জাতিসংঘকে 'অনির্বাচিত গ্লোবালিস্ট আমলাদের' একটি বামপন্থী এজেন্ডার প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করে জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, পশ্চিম গোলার্ধে কোনো হুমকি তৈরি হতে তিনি দেবেন না এবং প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন। এই অংশটি বলার সময় কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' বলে অভিহিত করলে কিউবান প্রতিনিধি দল কক্ষ ত্যাগ করে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার বিদায়ী ভাষণে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিভাজন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি পরাশক্তিদের মনে করিয়ে দেন যে, তাদের ক্ষমতা অসীম নয় এবং বিশ্বের সব দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
কূটনৈতিক ব্যস্ততার মাঝে ট্রাম্প ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সাথে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে উত্তর আটলান্টিক দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। ভাষণের শুরুতে তিনি অর্থনীতি, অভিবাসন এবং অপরাধ দমনে তার সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন, যা মূলত নভেম্বর নির্বাচনে ভোটারদের আকর্ষণ করার একটি কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




