কালো কুর্তা-পায়জামা ও টুপি পরা দুই তরুণের হাতে কালো রঙের বড় দুটি বন্দুক — এমন দৃশ্য নিয়ে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পার্ক, ব্যস্ত সড়ক কিংবা দোকানের সামনে ঘুরে ঘুরে তারা হঠাৎ করেই পথচারী, রিকশাচালক এমনকি শিশুদের দিকে বন্দুক তাক করছেন। ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে কেউ থমকে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ আতঙ্কে সরে যাচ্ছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকছেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এটিকে দেশে অস্ত্রের অবাধ বিস্তারের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের সমালোচনা করেছেন। তবে ভিডিওটি যে বাস্তব ঘটনা নয়, বরং মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য পরিকল্পিতভাবে তৈরি — এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুই তরুণের একজন।
নারায়ণগঞ্জের সিটি পার্কের (সাবেক শেখ রাসেল নহর পার্ক) বিভিন্ন এলাকায় ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে। নির্মাতার নাম লিমন তোহা, বন্দর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে বন্দুক হাতে থাকা আরেক তরুণের নাম ইয়াসিন, যিনি মূলত ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন। প্রথমে টিকটকের ‘ভাইবোন’ নামের অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যেখানে লিমন ও তাঁর বোন নানা ধরনের কনটেন্ট তৈরি করেন। পরে ‘লিমন সিন্স ২০০৪’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং ‘ওয়াফি লিমন’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও একই ভিডিও দেওয়া হয়। তিনটি অ্যাকাউন্টই তাঁর নিজের বলে জানিয়েছেন লিমন।
লিমন তোহা জানান, টিকটকে এমন ধরনের ভিডিওর ট্রেন্ড দেখে তিনি এটি তৈরি করেছেন। মূল লক্ষ্য ছিল বন্দুক দেখে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করা। তিনি বলেন, এটি মূলত ফানি ভিডিও হিসেবে বানানো হয়েছিল, কিন্তু ফেসবুকে দেওয়ার পর অনেকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছেন। মানুষের ভয় পাওয়ার অংশটুকুই কেবল প্রকাশ করা হয়েছে, পরে তাঁরা যে মজা করেছেন সেই অংশটি দেখানো হয়নি। পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও নাটকের দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের মতো করে ভিডিও বানান। পাকিস্তানি আদলের কনটেন্টে বেশি সাড়া পাওয়ায় ওই ধরনের ভিডিও তৈরির প্রবণতা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
নিজের কাজ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও দেশের প্রতি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট বলে দাবি করেন লিমন। মানুষকে বন্দুক হাতে ভয় দেখানো অপরাধ কি না — এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অপরাধ কি না তিনি জানেন না। অন্য দেশে অনেকেই এমন ভিডিও করেন, টিকটকের ট্রেন্ড দেখেই তিনি তৈরি করেছেন। এটি শুধুই মজার জন্য করা। ভিডিওতে ব্যবহৃত বন্দুকটি খেলনা বলে দাবি করে তিনি বলেন, ধারণের সময় পুলিশও বিষয়টি দেখেছে। প্রথমে কেউ কেউ ভয় পেলেও পরে খেলনা বন্দুক বুঝতে পেরে তাঁরা মজা করেছেন। পুলিশও প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝতে পেরেছে এটি খেলনা, তাই কোনো সমস্যা হয়নি। তবে পুলিশের প্রতিক্রিয়া ধারণ করা হলেও সেটি ঠিকমতো না আসায় ফেসবুকে দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
ওই দুই তরুণের বাড়ি বন্দর থানার মধ্যে, কিন্তু ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার আওতায়। ওসি সাজেদুর রহমান জানান, এ ধরনের ভিডিও সম্পর্কে তাঁরা অবগত নন। কেউ অভিযোগও করেনি। সিটি পার্ক এলাকায় পুলিশ ডিউটি করে, তাঁরা কিংবা পার্ক কর্তৃপক্ষও কিছু জানায়নি। খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আইন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলামের মতে, কাউকে কোনো টুল ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানো শাস্তিযোগ্য — তা খেলনা অস্ত্র দিয়ে হোক বা ভিডিও তৈরির উদ্দেশ্যে হোক। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে: প্রথমত, অস্ত্র দিয়ে জনগণকে ভয় দেখিয়ে প্যানিক তৈরি করা পুরোপুরি অপরাধ; দ্বিতীয়ত, মানুষের প্যানিক তৈরির ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে মানহানি করা সাইবার সিকিউরিটি আইনের আওতায় পড়ে।




