বাংলাদেশ সফরকে স্মরণীয় করতে জাপানি প্রবাদ ‘ইচিগো ইচিয়ে’—অর্থাৎ ‘একবার, এক সাক্ষাৎ’—বেছে নিয়েছেন দাইকি ইশিদা। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিটি মুহূর্ত অনন্য; একই দৃশ্য, একই সাক্ষাৎ আর কখনো হুবহু ফিরে আসে না। এই দর্শনের সঙ্গেই মিলে যায় কার্জন হলের বারান্দায় হঠাৎ পরিচিত হওয়া বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, কিংবা নিউমার্কেটের অচেনা পথচারীর কাছ থেকে পাওয়া আন্তরিক সহায়তা। ছয় দিনের এই ভ্রমণে দাইকি ও তাঁর বন্ধু আকারি সুয়েনো—উভয়েই আকিতা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী—ঢাকা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখেছেন।
কর্মসূত্রে বাংলাদেশে অবস্থানরত আকারির বাবার কারণে দেশটি নিজের চোখে দেখার আগ্রহ জন্মেছিল তাঁর মনে। সেই টানে বন্ধু দাইকিকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে পা রাখেন তিনি। নির্দিষ্ট কোনো ভ্রমণসূচি ছিল না তাঁদের; কোথায় যাবেন, কী দেখবেন—সেসবের কোনো পূর্বপরিকল্পনাও ছিল না। শুধু ঘুরে দেখা, নতুন কিছু জানা এবং যেভাবে দিন আসে সেভাবেই কাটিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। এই সময়ে কার্জন হল, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকা, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে, চা খেয়ে এবং রাস্তার খাবারের স্বাদ নিয়েই কেটেছে তাঁদের দিনগুলো।
ভ্রমণের একটি বিশেষ ঘটনা ঘটেছে নিউমার্কেটে। চায়ের দোকান খুঁজতে খুঁজতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন দুই জাপানি তরুণ। এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু দিকনির্দেশনাই দেননি, দোকান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে চা-ও খাইয়েছেন। এক কাপ চা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তোলা ছবিও তাঁদের স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। ছোট ছোট এই আন্তরিকতাই মুগ্ধ করেছে দুই পর্যটককে। আকারির ধারণা ছিল, বাংলাদেশ হয়তো খুব একটা উন্নত নয়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। দাইকি বিশেষভাবে অবাক হয়েছেন পোশাকের দোকানে। সেখানে ক্রেতাকে চা বা কফি পরিবেশন করার রীতি জাপানে তিনি কখনো দেখেননি বলে জানান। বাংলাদেশি পোশাক পরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময়ও তাঁরা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
খাবারের বিষয়েও নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে দুজনের। রাস্তার খাবার নিয়ে প্রথমে কিছুটা সংশয় ছিল আকারির। তাঁর আশঙ্কা ছিল, অপরিচিত খাবার খেলে শরীর খারাপ হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভ্রমণটি ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের রাস্তার খাবার বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তিনি। দুই দেশের খাবার তুলনা করতে গিয়ে দাইকি জানান, নান রুটি ও বিরিয়ানির স্বাদ তাঁর কাছে আলাদা; জাপানে নান পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের নানের স্বাদ ও গঠন ভিন্ন, দামও তুলনামূলক কম। দুজনের কাছেই বাংলাদেশি খাবার ‘সুস্বাদু’ লেগেছে।
ভাষার ক্ষেত্রেও কিছু শব্দ শিখে নিয়েছেন তাঁরা। দাইকি মনে রেখেছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ধন্যবাদ’ ও ‘দাম কত’—এই বাক্যগুলো। আকারি শিখেছেন ‘সুস্বাদু’ শব্দটি, যা খাবারের প্রশংসায় বেশ মানানসই। এসব শব্দ ও বাক্য তাঁর কাছে বাংলাদেশ সফরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
জাপান ও বাংলাদেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দাইকি বলেন, জাপানে মানুষ অনেক বেশি সময় কাটান স্মার্টফোনে। বিপরীতে বাংলাদেশে অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও সহজেই কথা বলা, হাসা ও যোগাযোগ তৈরি করার প্রবণতা তাঁর নজর কাড়েছে। তাঁর মতে, জাপান যদি বাংলাদেশ থেকে একটি গুণ গ্রহণ করতে পারে, তাহলে তা হওয়া উচিত ‘মিশে যাওয়ার ক্ষমতা’। তবে সবকিছুই প্রশংসনীয় নয় বলে মনে করেন তিনি। ট্রাফিক ব্যবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক মনে হয়েছে; স্থানীয় ব্যক্তিদের জন্যও এই ট্রাফিক নিরাপদ নয় বলে তাঁর ধারণা।
বাংলাদেশিরা জাপান সম্পর্কে কী ভাবেন, সেটিও জানতে চেয়েছিলেন দুই বন্ধু। অ্যানিমে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ না মিললেও, মানুষের মুখে জাপানের এত প্রশংসা শুনে দুই বন্ধু কিছুটা লজ্জাবোধ করেছেন। এই ভ্রমণের মাধ্যমে শুধু স্থান দেখাই নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন দুজন। কার্জন হলের সেই প্রথম সাক্ষাৎ থেকে নিউমার্কেটের চায়ের দোকান—প্রতিটি মুহূর্তই তাঁদের কাছে অমূল্য। বাংলাদেশ ছেড়ে জাপানে ফিরে গেলে নান রুটি ও বিরিয়ানির স্বাদই সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে বলে জানিয়েছেন দাইকি।




