রক্তচাপ বেড়ে গেলে যে মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দেবেই—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শরদিন্দু শেখর রায়। তাঁর মতে, উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক সময় এটি কোনো লক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর থাকতে পারে। শরীর ধীরে ধীরে বাড়তি চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেয় বলে মানুষ নিজেকে সুস্থ মনে করলেও ভেতরে ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর ক্রমাগত চাপ পড়ে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরীক্ষায় উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে। অর্থাৎ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই এই ক্ষতি শুরু হয়ে যেতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়লেও আজকাল তরুণদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস আছে, যারা অতিরিক্ত লবণ খান, শারীরিক পরিশ্রম করেন না, ধূমপান করেন কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন—তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অতিরিক্ত ওজন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় উপসর্গবিহীন থাকায় নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই শনাক্তের সবচেয়ে সহজ উপায়। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত বলে পরামর্শ দেন ডা. রায়। বিশেষ করে ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাড়িতে সঠিক মানের ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকলে নিয়মিত পরিমাপের সুযোগ তৈরি হয়। তবে মানসম্পন্ন যন্ত্র ব্যবহার ও সঠিক পদ্ধতিতে রক্তচাপ মাপা জরুরি। একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার মাপার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার পরিমাপ করতে হবে। রক্তচাপের মাত্রা ও ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।
উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ফল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া, ধূমপান পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। শারীরিক পরিশ্রম ও লবণ পরিহার রক্তচাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাদের ওষুধ প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসেছে মনে হলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
শরীর খারাপ হলেই আমরা সাধারণত চিকিৎসকের কথা ভাবি। কিন্তু কিছু সমস্যা কোনো অস্বস্তি ছাড়াই ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তাই রক্তচাপ বেশি কি না তা নিশ্চিত হতে শুধু ‘আমি ভালো আছি’ এই কথার ওপর ভরসা না করে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে হবে। ডা. রায়ের মতে, উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনুভূতি নয়, পরিমাপের অঙ্কটাই সত্য। তাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—চুপচাপ রক্তচাপ বাড়ছে না তো? এর উত্তর জানতে খুব বেশি কিছু লাগে না, শুধু একটু সময় নিয়ে রক্তচাপটা মেপে দেখতে হবে।




