রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার শান্তিপাড়া এলাকার পাকা সড়কের পাশ থেকে গত ২৮ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের নাম মোখলেছার রহমান (৫৮), তিনি পেশায় মিশুকচালক ছিলেন। পরে তাঁর ছেলে মিজানুর রহমান গঙ্গাচড়া মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন, তবে মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের ছয় দিন অতিবাহিত হলেও নিহতের মিশুকটি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তেমনিভাবে ঘটনার কোনো ক্লুও মেলেনি বলে জানা গেছে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মোখলেছারের বাড়ি গঙ্গাচড়ার নবনীদাস গ্রামে। ঘটনার পাঁচ দিন আগে তিনি তাঁর ছেলে মিজানুরকে সতর্ক করে বলেছিলেন, 'দেখেশুনে চলাফেরা করিও, আমাদের ডানে-বাঁয়ে অনেক শত্রু আছে।' মিজানুরের ভাষ্য, বাবা সব সময় ভয় পেতেন এবং প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে মেরে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করতেন। হুমকির পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর বাবার গলাকাটা লাশ উদ্ধার হয়।

নিহতের ছোট ভাই শাহিনুর ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ২৬ শতাংশ বসতভিটা নিয়ে প্রতিবেশী জাদু মিয়া, সেকেন্দার, মারজান ও সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ বিষয়ে আদালতে একাধিক মামলাও রয়েছে। সম্প্রতি একটি মামলায় মোখলেছারের পক্ষে রায় হওয়ায় প্রতিপক্ষের লোকজন ক্ষুব্ধ ছিল। ১৩ আগস্ট রংপুর আদালত চত্বরে ওই চারজন তাঁর ভাইকে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ শাহিনুরের। এর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি হত্যার শিকার হন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি মিশুকের জন্য কি কাউকে কুপিয়ে হত্যা করার প্রয়োজন আছে? পূর্বশত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এ বিষয়ে পুলিশকে জানানো হলেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাদী মিজানুর রহমান জানান, প্রতিপক্ষের নাম উল্লেখ করেই মামলা করতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু পুলিশ তা নেয়নি। অন্যদিকে অভিযুক্ত জাদু মিয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাত ১২টার পর বাড়ি ফিরে হত্যার খবর পান। জমি নিয়ে বিরোধের কথা স্বীকার করলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জোর দিয়ে বলেন। সেকেন্দার আলী, মারজান ও সাদেকুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস ছবুর বলেন, পরিবারের আনা অভিযোগ সঠিক নয়। মামলার বাদী যে অভিযোগ লিখে এনেছেন, সেটিই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে এবং পরিবারের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

নিহতের স্ত্রী মোসলেমা বেগম নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর স্বামীকে খুন করেছে। এখন পরিবারের অন্য কাউকে যে হত্যা করা হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? মোখলেছারের পরিবারে স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও নাতি-নাতনিসহ মোট ৯ জন সদস্য। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। মিশুক চালিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি চারটি এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন। প্রায় তিন লাখ টাকার ঋণ ছিল তাঁর। মৃত্যুর পর সংসারের খরচ চালানোই দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

নিহতের মেয়ে মোহসিনা জানান, সংসারের সব দায়িত্ব ছিল বাবার কাঁধে। বাবা নেই বলে ঘরে খাবার নেই, কয়েক দিন ধরে চুলাও জ্বলেনি। প্রতিবেশীরা খাবার দিয়ে যাচ্ছেন, তবে এভাবে কত দিন চলবে তা জানা নেই। একটি এনজিও ঋণের টাকা মওকুফ করলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে বলে তিনি জানান।