জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কাগজে-কলমে যথেষ্ট ভালো হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এই পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছেন। রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘দ্য সৈয়দ হুমায়ুন কবির মেমোরিয়াল রিসার্চ সিম্পোজিয়াম-২০২৬’ সম্মেলনে এক প্যানেল আলোচনায় তিনি এই কথা বলেন। বাংলার পাঠশালা ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অধ্যাপক আইনুন নিশাত সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল একটি উদীয়মান সমস্যা হিসেবে না দেখে, এর ভবিষ্যৎ প্রভাবের মডেল তৈরি করে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর পর পরিস্থিতি কেমন হবে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি, কারণ বর্তমান প্রজন্মের তরুণরাই ভবিষ্যতে এর চরম মূল্য দেবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দূর করতে কেবল পানির ট্যাংক স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও ব্যবহারিক দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, উত্তরবঙ্গ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রস্তুতি ভিন্ন হওয়া উচিত এবং আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান আমাদেরই করতে হবে।

বাংলাদেশের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, জলবায়ু সংক্রান্ত অনেক পরিকল্পনা বিদেশি সংস্থা ও সংগঠনের দ্বারা প্রভাবিত। এসব সংস্থা মনে করে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা নেই, ফলে তারা অর্থায়ন করে বিভিন্ন নথি তৈরি করায়, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তব কাজে না লেগে কেবল আলমারিতে জমে থাকে। এছাড়া জাতীয় নীতিগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সাথে যথাযথভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে না বলে তিনি জানান। একটি নির্দিষ্ট কাজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কৃষি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, যা আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।

সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে অস্ট্রেলিয়ান গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড এইজড কেয়ারের সিনিয়র রেগুলেটরি স্পেশালিস্ট শামারুহ মির্জা বলেন, কেবল ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে নীতি প্রণয়ন করলেই হয় না; এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, অর্থায়ন এবং জেলা পর্যায়ে প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, গবেষণার ফলাফলের চেয়ে বড় সমস্যা হলো সেই জ্ঞানকে সম্পদ বরাদ্দ ও টেকসই কার্যক্রমে রূপান্তর করা। তিনি প্রকল্পনির্ভর কাজের পরিবর্তে ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের কথা বলেন এবং লিঙ্গভিত্তিক ও ক্ষমতার বৈষম্য কমিয়ে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ সমাধান তৈরির আহ্বান জানান। অন্যদিকে চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনীম জারা উল্লেখ করেন, গর্ভবতী নারীদের আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড দেওয়ার জাতীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। তিনি মনে করেন, জনগণকে সহজ ভাষায় তথ্য দিলে তারা সেবার দাবি জানাতে পারে, যা সেবাদানকারীদের মধ্যে জবাবদিহিতা তৈরি করবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেনের সভাপতিত্বে এই সম্মেলনের সমাপনী সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেসলি ওবিওরা, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির মালাবিকা সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফোয়ারা তাসমীম। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট সাতটি পৃথক সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্বাস্থ্য, জীবনজীবিকা এবং নগর স্থিতিস্থাপকতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে বিআইজিডি-র ইমরান মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কবিতা বোসের মতো বিশেষজ্ঞগণ অংশ নেন।