জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্মান পর্যায়ে প্রতি বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতিটি বিভাগের অর্ধেক শিক্ষার্থীকে সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়। এই বৃত্তির পরিমাণ মাসে ৫০০ টাকা, যা ২০১৮ সালের পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে এই অর্থ এখন আর প্রকৃত সহায়তা নয়, বরং প্রতীকী প্রণোদনা বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি, নিয়মিত সময়ে বৃত্তির অর্থ হাতে না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখা সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে পাঠদান শুরু হওয়ার কয়েক বছর পর সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তি চালু হয়। ১৯৮০-এর দশকে এর পরিমাণ ছিল মাসে ৭৫ টাকা, পরে তা ১০০ ও ১২৫ টাকায় উন্নীত হয়। দীর্ঘদিন একই হার থাকার পর ২০১৮ সালে তা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী চার বছরের স্নাতকে প্রতিবার বৃত্তি পেলে মোট ২৪ হাজার টাকা পান।
তবে বৃত্তি পাওয়ার পরও অর্থ হাতে পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে ২০১৯-২০ (৪৯তম ব্যাচ) থেকে ২০২৫-২৬ (৫৫তম ব্যাচ) পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অধ্যয়ন করছেন। কিছু বিভাগে ২০১৮-১৯ (৪৮তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরাও স্নাতকোত্তরে আছেন। অথচ এখনো ৪৮ ও ৪৯তম ব্যাচের স্নাতকের চতুর্থ বর্ষ, ৫০তম ব্যাচের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষ, ৫১তম ব্যাচের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ এবং ৫২তম ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের বৃত্তির অর্থ বকেয়া রয়েছে।
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, "আমরা ইতিমধ্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। কিন্তু অনার্সের চতুর্থ বর্ষের বৃত্তির টাকা এখনো পাইনি। সময়মতো পেলে তা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের সময় কাজে লাগত।"
বৃত্তির আবেদন প্রক্রিয়াও জটিল। তালিকা প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হয়। হল থেকে ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করে বিভাগে জমা দিতে হয়, বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরের পর আবার হলে জমা, তারপর প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষর শেষে হিসাব শাখায় যায়, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মুখলাতুল জিনান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাংক হিসাবের তথ্য রয়েছে, তাই সরাসরি টাকা পাঠানো সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি তৈরি হয়। পুরো প্রক্রিয়া অটোমেশনের আওতায় আনা উচিত।"
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ও ট্রাস্টভিত্তিক আরও অন্তত ২০টি বৃত্তি এবং ৩টি স্বর্ণপদক চালু রয়েছে। তবে এসব বৃত্তির বড় অংশ একই ধরনের মেধার মানদণ্ডে দেওয়া হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী একই ফলাফলের ভিত্তিতে একাধিক ট্রাস্ট বৃত্তি বা স্বর্ণপদক পাওয়ার সুযোগ পান। যেমন স্নাতকে প্রথম বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে ছয় অনুষদের সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের জন্য আকলিমা আনোয়ার ট্রাস্ট ফান্ড এবং মেজর জেনারেল আবদুল মান্নান সিদ্দিকী ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফলাফলকারীদের জন্য মীর মুয়াজ্জেম আলী ও অজিফা আলী বৃত্তি, আসাদুল কবির স্বর্ণপদক ও বৃত্তি, ড. সুরত আলী খান স্বর্ণপদক এবং শরফুদ্দিন স্বর্ণপদক ও বৃত্তি। বিভাগভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলকারীদের জন্য শহীদ হাকিম মো. সাঈদ বৃত্তি, আমিনা আইনউদ্দিন মেমোরিয়াল বৃত্তি, সালাউদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড, কামরুল হোসেন চৌধুরী ট্রাস্ট ফান্ড, অধ্যাপক আবু রুশদ মতিনউদ্দিন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ড, রহিমা-হাকিম ট্রাস্ট ফান্ডসহ আরও কয়েকটি বৃত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সাধারণ বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি নামে দুটি বৃত্তি রয়েছে। স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষের ফলাফলের ভিত্তিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর ২৮১ জন সাধারণ বৃত্তি পান, যারা মাসে ৪৫০ টাকা, এককালীন ৯০০ টাকা এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান। মেধাবৃত্তি পান ১৬ জন, তারা মাসে ১ হাজার ১২৫ টাকা, এককালীন ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান। ইউজিসিও একটি বৃত্তি দেয়, যার আওতায় অনুষদভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলকারী ছয়জন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি ব্যাচে স্নাতকে চার বর্ষে চারজন বৃত্তি পান। তারা প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা, বই কেনার জন্য এককালীন ২ হাজার টাকা এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পান।
বৃত্তির টাকা বাড়ানোর দাবিতে সম্প্রতি সিনেট অধিবেশনেও আলোচনা হয়েছে। সহউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, "সর্বশেষ ২৭ জুনের সিনেট অধিবেশনে জাকসুর প্রতিনিধিরা সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তির টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। আমরা একটি কমিটি করেছি, ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বৃত্তির টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে।" তবে এর বাস্তবায়ন কবে হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, বৃত্তির অর্থ বিতরণে দেরির বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ বলেন, "সাধারণত কোনো শিক্ষাবর্ষের সব বিভাগের পরীক্ষা শেষ হলে তারপর একসঙ্গে টাকা দেওয়া হয়। কিছু বিভাগের পরীক্ষা দেরিতে শেষ হয়, তাই বৃত্তির টাকা পাঠাতেও দেরি হয়।"
এই সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করা জরুরি।




