স্মার্টফোনের ক্যালকুলেটরে কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করার চেষ্টা করলেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে 'Math Error' বা 'Cannot divide by zero'। স্কুলের অঙ্কের ক্লাসে শিক্ষকেরা কড়া ভাষায় বলে থাকেন, যেকোনো সংখ্যাকে যেকোনো সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায়, কিন্তু শূন্য দিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, শূন্যের এমন কী দোষ? এর উত্তর খুঁজতে হলে গণিতের গভীরে যেতে হয়, ইতিহাসের পাতাও ঘুরে আসতে হয়।

ভাগের সহজ ব্যাখ্যা হলো, এটি বারবার বিয়োগের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন, ২০টি আপেল ৫ জন বন্ধুর মধ্যে ভাগ করতে হলে ২০ থেকে বারবার ৫ বিয়োগ করা হয়। প্রথমে ১৫, তারপর ১০, তারপর ৫, শেষে ০ — মোট ৪ বার বিয়োগের পর আপেল শেষ। অর্থাৎ ২০ ÷ ৫ = ৪। কিন্তু একই কাজ শূন্য দিয়ে করলে কী ঘটে? ২০ থেকে বারবার শূন্য বিয়োগ করলে সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে — ২০, ২০, ২০… এই প্রক্রিয়া কখনো শেষ হয় না, কোনো নির্দিষ্ট ফলও পাওয়া যায় না। এটি শূন্য দিয়ে ভাগ অসম্ভব হওয়ার প্রথম প্রমাণ।

গণিতে ভাগকে গুণের বিপরীত প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা হয়। ১০ ÷ ২ = ৫, অর্থাৎ ৫ × ২ = ১০। এখন ১০ ÷ ০ = 'ক' ধরলে, 'ক' × ০ = ১০ হতে হবে। কিন্তু যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে ফল সবসময় শূন্য। এমন কোনো সংখ্যা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করে ১০ পাওয়া যায়। তাই গণিতবিদেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শূন্য দিয়ে ভাগ করা অর্থহীন।

তাহলে শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কী হয়? ০ ÷ ০ = 'খ' ধরলে, 'খ' × ০ = ০ হতে হবে। 'খ'-এর জায়গায় ৫ বসালেও সমীকরণ মেলে, ১০০ বসালেও মেলে। পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যা বসালেই সমীকরণ সত্য হয়। কিন্তু গণিতের শর্ত হলো, প্রতিটি হিসাবের একটি নির্দিষ্ট ও অনন্য উত্তর থাকতে হবে। যেহেতু এখানে অসংখ্য উত্তর পাওয়া যায়, তাই একে বলা হয় অনির্ণেয় বা অসংজ্ঞায়িত।

ইতিহাসে শূন্যের ধারণা প্রথম এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে। সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর 'ব্রাহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত' গ্রন্থে শূন্যের যোগ, বিয়োগ, গুণের নিয়ম লিপিবদ্ধ করেন, কিন্তু ভাগের ক্ষেত্রে তিনি ভুল করেছিলেন — তিনি বলেছিলেন ০ ÷ ০ = ০। প্রায় ৫০০ বছর পর দ্বিতীয় ভাস্কর যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে ফল অসীম হবে বলে মত দেন, যাকে তিনি 'খহর' নামে অভিহিত করেন। তবে আধুনিক গণিত প্রমাণ করেছে, ভাস্করের ধারণাও ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, ধনাত্মক দিক থেকে শূন্যের কাছে এলে ফল ধনাত্মক অসীমের দিকে যায়, কিন্তু ঋণাত্মক দিক থেকে এলে ফল ঋণাত্মক অসীমের দিকে ধাবিত হয়। একই বিন্দুতে দুই দিক থেকে ভিন্ন ফল পাওয়ায় ভাস্করের তত্ত্ব বাতিল করে একে অসংজ্ঞায়িত ঘোষণা করা হয়েছে।

শূন্য দিয়ে ভাগ করার অনুমতি দেওয়া হলে গণিতের ভিত্তিই ভেঙে পড়বে। একটি সহজ বীজগণিতের উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। ধরুন a = b। দুই পাশে a গুণ করে a² = ab, তারপর দুই পাশ থেকে b² বিয়োগ করলে a² - b² = ab - b²। বাম পাশে (a+b)(a-b) এবং ডান পাশে b(a-b) পাওয়া যায়। দুই পাশ থেকে (a-b) বাদ দিলে a+b = b। যেহেতু a = b, তাই 2b = b, অর্থাৎ 2 = 1! এই অযৌক্তিক ফলটি ঘটে শুধুই কারণ (a-b) আসলে শূন্য, এবং আমরা অজান্তেই সমীকরণটিকে শূন্য দিয়ে ভাগ করেছি। এ কারণেই গণিতবিদেরা সতর্ক করে দেন, শূন্য দিয়ে ভাগ করা যাবে না — করলে গণিতের সব যুক্তি ও সূত্র ধ্বংস হয়ে যাবে।