প্রথাগত মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে ঐতিহ্য উপলব্ধি করানোর লক্ষ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আয়োজন করেছে ‘চেরিশিং আওয়ার হেরিটেজ’ নামক একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। ঐতিহ্যের চলমানতাকে জীবন্ত সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখার প্রগতিশীল চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। মূলত বিভাগের ৪০৬ নম্বর কোর্সের অংশ হিসেবে গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই ইভেন্টটি অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরানের তত্ত্বাবধানে এবং সহযোগী অধ্যাপক সাবিকুন নাহার সিথির সহায়তায় ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা এই ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যভিত্তিক ‘কসপ্লে’ বা সজ্জাপর্ব, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাসন রাজা, মা মনসা এবং রানী ভবানীর মতো ঐতিহাসিক চরিত্রে নিজেদের ফুটিয়ে তোলে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রদর্শনী ও স্বাদ গ্রহণের সুযোগ ছিল, যা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও নির্দেশ করে। এছাড়া উক্ত অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ছাত্রী ও বর্তমান উদ্যোক্তা ফোয়ারা ফেরদৌস, পৃথিলা শাহনেওয়াজ এবং ইশরাত নশিনের তিনটি স্টল বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আলোচনা সভায় ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিচালনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়। বিশেষ করে ইউনেস্কোর উদ্যোগ, বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য এবং জিআই (Geographical Indication) অধিকারের বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয়। জামদানি, মসলিন, শীতলপাটি ও টাঙ্গাইল শাড়ির মতো পণ্যগুলো যে কেবল বাণিজ্যিক সামগ্রী নয়, বরং আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা বক্তারা উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউনেস্কোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ টু বাংলাদেশ ও হেড অব অফিস ড. সুসান ভাইজ যেকোনো সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় আধুনিক পদ্ধতিতে প্রামাণ্য দলিল বা ডকুমেন্টেশন তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সাবভিনা মনির তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কথা জানিয়ে এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া প্রথম আলোর ‘হাল ফ্যাশন’-এর পরামর্শক শেখ সাইফুর রহমান ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে শিকড়ের ঐতিহ্যকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ। ড. মাসউদ ইমরান তাঁর সূচনা বক্তব্যে প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণের পুরনো ধারণার পরিবর্তে নতুন ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সবশেষে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মালিহা নার্গিস আহমেদ উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান। আয়োজকদের মতে, ঐতিহ্য কেবল কাচের বাক্সে বন্দী কোনো বস্তু নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যা নিয়মিত চর্চা ও সংরক্ষণের মাধ্যমেই আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।




