ট্রেনের অপেক্ষার ফাঁকে বা ক্যাফেতে একা বসে সময় কাটানোর মুহূর্তগুলোতে মানুষ এখন মোবাইল স্ক্রল করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সেই ধারা বদলে বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সিঙ্গাপুর সরকার। দেশটির নাগরিকদের পড়ার অভ্যাস পুনরুজ্জীবিত করতে পাঁচ বছর মেয়াদি এক বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যেখানে বই পড়লে মিলবে পয়েন্ট এবং সেই পয়েন্ট জমে উঠলে পাওয়া যাবে নগদ অর্থ বা ছোট উপহার।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ডের অধীনে চালু হওয়া এই প্রকল্পে একজন পাঠক অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়লে পাবেন ২০ পয়েন্ট। প্রতিদিন একবার নিজের পড়ার সময়সীমা সরকারি ওয়েবসাইটে জমা দিলে ১ হাজার পয়েন্ট সংগ্রহ করা গেলে মিলবে ১ সিঙ্গাপুর ডলার। অর্থাৎ একটানা ৫০ দিন বই পড়লেই প্রথমবারের মতো পুরস্কারের অঙ্কটি জমা হবে। তবে এই পদ্ধতিতে কেউ দ্রুত বড় অঙ্কের টাকা উপার্জন করতে পারবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বর্তমান যুগে ডুমস্ক্রলিং বা মোবাইলের পর্দায় একটানা স্ক্রল করার অভ্যাস মানুষের গভীর পড়ার ক্ষমতাকে ক্রমেই কমিয়ে দিচ্ছে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ডের প্রধান মেলিসা ট্যাম বলেন, 'ছোট লেখা হয়তো দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেয়, কিন্তু দীর্ঘ লেখা বা বই পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ হবে কৌতূহলী এবং সচেতন।'

শিক্ষাবিদদের মতে, ইন্টারনেটে অতিমাত্রায় সময় কাটানোর ফলে ব্রেইন রট বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা পরীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সিঙ্গাপুর ও চীনের শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের গবেষক লো চিন ই জানান, পড়াকে গেমের মতো আকর্ষণীয় করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, 'নিয়মিত পাঠকদের কাছে ১৫ মিনিট সময় খুবই কম মনে হতে পারে, তবে নতুনদের জন্য এটি চমৎকার একটি সূচনা। মানুষ এখনো স্ক্রিনে লেখা পড়ে, কিন্তু মনোযোগ দিয়ে গভীরভাবে পড়ার অভ্যাসটি অনেকটাই হারিয়ে গেছে।'

এই প্রকল্প নিয়ে সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে নানা মতামত। অনেকেই মনে করছেন, ভালোবাসা থেকে বই পড়া উচিত, টাকার লোভে নয়। তবে উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেক তরুণও। ২৮ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর চারমেইন লিম বলেছেন, বাসে বা ট্রেনে টিকটক দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বুক ক্লাব পরিচালক অ্যাশলি চিয়ার মনে করেন, পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য এই ছোট্ট প্রণোদনা প্রয়োজন ছিল, তবে সাফল্য তখনই আসবে যখন মানুষ কৌতূহলী পাঠকে পরিণত হবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়বে।

৩২ বছর বয়সী ঝুঁকি বিশ্লেষক আইজ্যাক নিও জানান, মাধ্যমিক স্কুলে ওঠার পর পরীক্ষার চাপে আনন্দের জন্য বই পড়ার সুযোগ কমে যায়। নিজের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ২০২৫ সালে 'মডার্ন মেনস বুক ক্লাব' প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ক্লাবের অনেক সদস্য বহুদিন বই স্পর্শ করেননি, কিন্তু এখন নতুন করে পড়ায় ফিরছেন।

মনোবিজ্ঞানী চ্যারিসা এনজি সতর্ক করে বলেন, যাঁদের মধ্যে সামান্য হলেও পড়ার অভ্যাস আছে, তাঁদের জন্য এই আর্থিক প্রণোদনা কাজে লাগতে পারে। কিন্তু যাঁদের পড়ার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই, টাকার লোভে তাঁদের মধ্যে স্থায়ী অভ্যাস তৈরি করা খুবই কঠিন। মোবাইলের তাৎক্ষণিক বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এই ছোট পুরস্কার কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ড জানিয়েছে, বছরের শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চলবে এবং পাঠকদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে এতে নতুন সুবিধা যুক্ত করা হবে। চাইলে পাঠকেরা বই পড়ে অর্জিত অর্থ দাতব্য তহবিলেও দান করতে পারবেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৭৫ লাখ মিনিট বই পড়া এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।