লন্ডনের ঐতিহাসিক বার্বার-সার্জনস হলে সম্প্রতি 'ফরচুন সিইও ফোরাম' অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ইউরোপের অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলে। এই বিশেষ সম্মেলনে মাস্টারকার্ড, ফেরারি, ব্ল্যাকরক, শেল, ইডিএফ, গুগল, ওপেনএআই, হানিওয়েল, অ্যানথ্রোপিক এবং মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী বা সিইওরা উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা, যেমন—উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ, মার্কিন রাজনীতির অনিশ্চয়তা এবং চীনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ইউরোপ কীভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে, তা ছিল আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ফোরামে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ মূলত চারটি প্রধান সংকটের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন: ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাপ, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উৎপাদনশীলতার হ্রাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সম্ভাবনা ও এর নেতিবাচক দিকগুলোর মোকাবিলা। এই আলোচনাগুলো অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছিল যাতে ব্যবসায়িক প্রধানরা অকপটে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।
এই সম্মেলনের প্রাক্কালে ফরচুন তাদের নতুন 'ফরচুন ৫০০ ইউরোপ' তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকা অনুযায়ী, ইউরোপের শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানি চলতি বছর ১৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মুনাফা ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে ইউরোপের জিডিপির অর্ধেক। এই আয়ের বড় অংশ এসেছে অর্থায়ন, জ্বালানি এবং গাড়ি নির্মাতা শিল্প থেকে। তবে ব্যবসায়িক নেতাদের মতে, ইউরোপের এই বিশাল আর্থিক সক্ষমতা এবং মেধাশক্তিকে প্রকৃত প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে নীতি নির্ধারণ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ পরিবেশের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
পরিবেশগত স্থায়িত্ব বা গ্রিন ট্রানজিশন নিয়ে আলোচনায় এক ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক না থাকলেও, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে অনেক সিইও মনে করেন, এই সবুজ রূপান্তরকেই ইউরোপের জন্য একটি বিশেষ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে জার্মান ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান জিইএ গ্রুপ-এর কথা উল্লেখ করা হয়, যারা তাদের ব্যবসায়িক মডেলে জ্বালানি দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের নকশা করা নতুন যন্ত্রপাতির মাধ্যমে একটি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মিল্ক পাউডার তৈরির জ্বালানি খরচ ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আতঙ্ক অপেক্ষা বাস্তববাদিতার প্রাধান্য ছিল বেশি। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ঝুঁকি, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া এআই-এর কর্মকাণ্ডের দায়ভার কে নেবে এবং চাকরির বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, মূল আলোচনা ছিল এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং এর থেকে প্রাপ্ত মুনাফা নিয়ে। ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মনীতির পক্ষে মত দিয়েছেন, তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই নিয়মগুলো যেন উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত না করে বরং উৎসাহিত করে। পাশাপাশি, মার্ক বেনিওফ সহ অনেক নেতা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের তৈরি পণ্যের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।




