ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ঘুষ কেবল একটি সামাজিক অপরাধ বা অনৈতিক কাজ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর মহাপাপ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতা—উভয় পক্ষকেই অভিশপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্য ব্যক্তির সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। এছাড়া সুনানে আবু দাউদ এবং আল-মুজামুল আওসাত-এর হাদিস অনুযায়ী, ঘুষের লেনদেনে জড়িত উভয় পক্ষই পরকালে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।

ইসলামি দণ্ডবিধির পরিভাষায় অপরাধের শাস্তিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। চুরির জন্য হাত কাটা বা ব্যভিচারের শাস্তির মতো ঘুষের জন্য কোরআন বা হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনযোগ্য শাস্তি বা 'হদ' নির্ধারিত নেই। এই কারণে ঘুষ গ্রহণকে 'হদ' অপরাধের আওতায় না রেখে 'তাজির' বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অর্থ হলো, অপরাধের ধরন এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কাজী বা বিচারক শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করবেন।

বিশেষ করে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিচারক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই অপরাধ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপ্রধান বা বিচারক অপরাধীকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করতে পারেন। এছাড়া অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী কঠোর কারাদণ্ড, চাবুক মারা, আর্থিক জরিমানা অথবা সম্পূর্ণ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করার বিধান রয়েছে। আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়ার বরাত দিয়ে জানা যায় যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা রোধে এই শাস্তির প্রয়োগ কঠোর হতে পারে।

শাস্তির পাশাপাশি ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের পরিণতির বিষয়েও ইসলামি আইনে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ঘুষের অর্থ কখনোই হালাল হয় না এবং এটি নিজের অধিকারে রাখা নিষিদ্ধ। ইবনে আবিদিনের 'রদ্দুল মুহতার' অনুযায়ী, ঘুষের অর্থ অবশ্যই তার প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে অথবা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে (বাইতুল মাল) জমা করতে হবে। অন্যথায় এই অবৈধ সম্পদের বোঝা দুনিয়া ও পরকাল উভয় জায়গাতেই অপরাধীর জন্য কষ্টের কারণ হবে।

বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে ইসলামি আইনবিদদের মতে, যেহেতু একটি ঘুষের বিনিময়ে অনেক সময় নিরপরাধ মানুষ কারাবন্দি হয় কিংবা প্রকৃত হকদার তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাই সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে রাষ্ট্র চাইলে কঠোরতম 'তাজির' বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। সংক্ষেপে, নির্দিষ্ট কোনো বেত্রাঘাতের সংখ্যা নির্ধারিত না থাকলেও, বিচারকের ইচ্ছানুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী জেল এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে এই অপরাধ দমনের পথ খোলা রাখা হয়েছে।