ইসলামিক জীবনদর্শনে জুয়া, যাকে 'মাইসির' বা 'কিমার' বলা হয়, তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো উৎপাদনশীল শ্রম, বৈধ ব্যবসায়িক চুক্তি বা বিনিময়ের বদলে কেবল ভাগ্য আর ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে অন্যের সম্পদ দখল করার প্রচেষ্টাকে ইসলামে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে ক্যাসিনো, তাসের খেলা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন বেটিং এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত জুয়া—সবই এই নিষিদ্ধ কাজের আওতায় পড়ে। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়িদাহ-র ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মদ, মূর্তিপূজা এবং জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং মুমিনদের এগুলো থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করতে পারে। জুয়ার বিধ্বংসী প্রভাব একজন ব্যক্তির পাশাপাশি তার পরিবার ও সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাকেও পঙ্গু করে দেয়। এই আসক্তির ফলে সৃষ্ট সাতটি প্রধান ক্ষতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রথমত, জুয়া মানুষের মনে অসুস্থ লোভ ও প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। কোনো খেলায় পরাজিত হলে বিজয়ীর প্রতি হিংসা ও ক্ষোভ তৈরি হয়, যা সামাজিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে চরম শত্রুতার সৃষ্টি করে। এছাড়া এটি মানুষকে ইবাদত ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সুরা মায়িদাহ-র ৯১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মাঝে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে তাদের গাফেল করে।

দ্বিতীয়ত, এটি অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাতের একটি মাধ্যম। কোনো বৈধ বিনিময়মূল্য ছাড়া অন্যের ধনসম্পদ গ্রাস করা স্পষ্ট জুলুম। সুরা নিসা-র ২৯ নম্বর আয়াতে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা বৈধ হলেও অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, জুয়াড়ির দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। যেহেতু জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ শতভাগ হারাম, তাই সেই অর্থ দ্বারা গঠিত শরীর ও জীবন আল্লাহর দরবারে আমল কবুল হওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তির খাদ্য, পানীয় এবং পোশাক হারাম উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত, তার কাতর প্রার্থনাও আল্লাহ কবুল করেন না।

চতুর্থত, এই নেশা মানুষকে দ্রুত অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দেয়। সাময়িক কিছু জয়ের প্রলোভনে পড়ে মানুষ বড় বাজি ধরে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সঞ্চয়, স্থাবর সম্পত্তি ও ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মদ ও জুয়ার ভেতরে কিছু সাময়িক উপকার থাকলেও এর পাপ ও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।

পঞ্চমত, জুয়া মারাত্মক মানসিক অস্থিরতা ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। ঋণের বোঝা ও অর্থ হারানোর বিষাদ থেকে জুয়াড়ি তীব্র হতাশায় ভোগে, যার প্রভাব পড়ে তার দাম্পত্য জীবনে। এর ফলে পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং চরম পর্যায়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে।

ষষ্ঠত, জুয়ার আসক্তি অপরাধের বিস্তার ঘটায়। ঋণের টাকা জোগাড় করতে বা পুনরায় বাজি ধরতে গিয়ে মানুষ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও দুর্নীতির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা সমাজের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়।

সপ্তমত, পরকালে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সুনানে নাসায়ির একটি হাদিস অনুযায়ী, জুয়াড়ি এবং পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের মতো চার শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

জুয়াকে সমূলে উৎপাটন করতে নবীজি (সা.) অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কেবল কথার ছলে কাউকে জুয়া খেলার প্রস্তাব দেয়, তার জন্যও কাফফারা হিসেবে সদকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি পাশা খেলার বিষয়টিকেও অত্যন্ত ঘৃণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিশেষে, ডিজিটাল বা প্রচলিত সব ধরনের জুয়া মূলত একটি নরকীয় ফাঁদ। ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করতে হালাল উপার্জনের পথে ফিরে আসা এবং এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা আবশ্যক।