বিয়ের সময় কনের পক্ষ থেকে বংশমর্যাদা ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য অনেক সময় লাখ লাখ বা কোটি টাকার দেনমোহর দাবি করা হয়। বরের পক্ষও প্রায়শই মনে করে, কাবিনে লেখা অঙ্কটি কেবল কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে নগদ পরিশোধের প্রয়োজন পড়বে না। এমন ধারণা নিয়ে তারা দলিলে স্বাক্ষর করে বসে। কিন্তু ইসলামি ফিকহ এবং রাষ্ট্রীয় আইন—কোনো ক্ষেত্রেই এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।

দেনমোহর ইসলামি বিধানে নারীর একান্ত ব্যক্তিগত সম্পদ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, “তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর ফরজ দায়িত্ব হিসেবে প্রদান করো।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৪) অর্থাৎ এটি স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার, যা থেকে স্বামী বা তার পরিবারের কেউ ভাগ পেতে পারে না। এমনকি কনের পিতা-মাতা বা অভিভাবকও এই সম্পদে হস্তক্ষেপ করার কোনো বৈধ ক্ষমতা রাখেন না। স্ত্রী যদি নিজের ইচ্ছায় কোনো চাপ ছাড়া দেনমোহরের অংশ ক্ষমা করে দেন, তবেই কেবল স্বামী সেই অংশ থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন; অন্যথায় তা আদায়যোগ্য থেকে যায়।

প্রচলিত একটি সমস্যা হলো, অনেক সময় গোপন বৈঠকে নির্ধারিত দেনমোহরের চেয়ে অনেক বেশি অঙ্ক জনসমক্ষে কাবিননামায় লেখা হয়—শুধু সামাজিক প্রতিপত্তির খাতিরে। এই প্রসঙ্গে ইসলামি আইনবিদ ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেছেন, যদি গোপন বৈঠকে একটি নির্দিষ্ট মোহর ধার্য করা হয়, কিন্তু প্রকাশ্যে অহমিকা প্রদর্শনের জন্য কয়েকগুণ বেশি অঙ্ক লেখা হয় এবং তাতে সম্মতি দেওয়া হয়, তবে কাজি বা বিচারক লিখিত চুক্তি অনুযায়ীই প্রকাশ্য দেনমোহর কার্যকর করবেন। বর যদি দাবি করেন যে সেটি নিছক প্রদর্শনীর জন্য লেখা হয়েছে, তবে অকাট্য প্রমাণ ছাড়া তাঁর সেই দাবি আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, ৩/১০৩–১০৬) সুতরাং কাবিনে স্বাক্ষর করলেই সেই অঙ্ক বরের জন্য অপরিশোধ্য ঋণে পরিণত হয়।

দেনমোহর পরিশোধের ইচ্ছা না রেখে শুধু বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য বড় অঙ্কে সম্মতি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে চরম প্রতারণা। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে কম বা বেশি দেনমোহর দেওয়ার অঙ্গীকার করে বিবাহ করল, অথচ মনে মনে তার সেই দেনমোহর পরিশোধ করার বিন্দুমাত্র নিয়ত ছিল না এবং সে তাকে ধোঁকা দিল—অতঃপর সে তার দেনমোহর পরিশোধ না করেই মারা গেল, তবে কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর দরবারে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৩৩) এ থেকে স্পষ্ট যে, দেনমোহরকে হালকাভাবে নেওয়া বা পরিশোধ না করার সংকল্প করা মহাপাপ।

বাকি দেনমোহর নিয়ে অনেকের ধারণা, সময়মতো পরিশোধ না করলে তা মাফ হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামি বিধানে তা সঠিক নয়। দেনমোহরের একটি অংশ নগদে আর বাকি অংশ বাকিতে পরিশোধের ব্যবস্থা থাকতে পারে; তবে ‘বাকি’ থাকার অর্থ কখনোই দায়মুক্তি নয়। স্ত্রী যেকোনো সময় তাঁর বিলম্বিত দেনমোহর দাবি করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এমনকি স্বামী যদি স্ত্রীকে নিয়ে সারা জীবন সংসারও করে থাকেন, তবুও দেনমোহর স্বামীর জিম্মায় একটি অপরিশোধিত ঋণ হিসেবে বহাল থাকে। ইমাম ইবনে কুদামাহ (রহ.) বলেছেন, স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধ না করে মারা যান, তবে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে ওয়ারিশদের মধ্যে মিরাস বণ্টনের আগেই স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করা ওয়াজিব। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ৯/১৮০)

অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সা.) দেনমোহর সহজ ও সহনশীল রাখার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নিজের কন্যাদের বিবাহে বা স্ত্রীদের দেনমোহরে কখনো অতি উচ্চ অঙ্ক নির্ধারণ করেননি। বলেছেন, “সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো সেটি, যার খরচ ও দেনমোহর সবচেয়ে সহজ এবং নাগালের মধ্যে থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৫২৯) তাই সমাজে প্রচলিত অযথা দেনমোহর বৃদ্ধির প্রবণতা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী।