প্রসবকালীন তীব্র কষ্টের সময় নামাজ আদায় করা হবে কি না, তা নিয়ে অনেক গর্ভবতী নারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মনে দ্বিধাবোধ তৈরি হয়। ইসলামের মৌলিক বিধান অনুযায়ী, যতক্ষণ একজন মানুষের চেতনা ও বিবেক সচল থাকে, ততক্ষণ নামাজের বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না। তবে শারীরিক অসুস্থতা বা কষ্টের তীব্রতা অনুযায়ী নামাজ পড়ার পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ শিথিলতা বা 'রুখসত' প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে অসুস্থতার কারণে নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই, বরং পরিস্থিতিভেদে বসে, শুয়ে কিংবা ইশারায় নামাজ পড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য নামাজ ফরজ থাকার প্রধান শর্ত হলো তিনি ঋতুস্রাব (হায়েজ) এবং প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (নেফাস) থেকে পবিত্র থাকা। এই দুটি বিশেষ অবস্থা ছাড়া অন্য কোনো অসুস্থতার কারণে নামাজ মাফ হয় না। ফলে প্রসববেদনা শুরু হলেই নামাজ বন্ধ হয়ে যায় না। যদি কেবল তলপেটে বা কোমরে তীব্র সংকোচন ও ব্যথা থাকে কিন্তু কোনো রক্ত নির্গত না হয়, তবে একজন অসুস্থ ব্যক্তি যেভাবে তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করেন, প্রসূতি মাকেও সেভাবেই নামাজ আদায় করতে হবে।
প্রসববেদনার সাথে রক্তক্ষরণের বিষয়টি বিভিন্ন মাজহাবের দৃষ্টিতে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। হাম্বলি মাজহাবের মতে, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক থেকে তিন দিন আগে যদি তীব্র ব্যথার সাথে রক্তপাত শুরু হয়, তবে তাকে 'নেফাস' হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেই মুহূর্ত থেকে ওই নারী নামাজ ও রোজা থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে প্রসববেদনা ছাড়া রক্ত আসলে তা নেফাস নয়, বরং অসুস্থতাজনিত রক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, হানাফি ও শাফেয়ি মাজহাবের বিধান অনুযায়ী, সন্তানের অধিকাংশ দেহ বা পুরো শরীর মাতৃগর্ভ থেকে বের হওয়ার আগে যে রক্ত নির্গত হয়, তা কখনোই 'নেফাস' নয়; বরং তাকে 'ইস্তিহাজা' বা নষ্ট রক্ত বলা হয়। হানাফি ফিকহ মতে, নেফাস শুরু হয় সন্তান প্রসবের ঠিক পর মুহূর্ত থেকে। তাই এর আগে রক্তপাত হলেও প্রতি ওয়াক্তের জন্য ওজু করে একজন অপারগ বা মা’জুর ব্যক্তির ন্যায় নামাজ আদায় করতে হবে।
প্রসূতি মায়েদের জন্য নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সহজ নিয়ম রয়েছে। প্রথমত, শারীরিক অক্ষমতার কারণে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে না পারলে বসে এবং তাতেও সম্ভব না হলে কাত হয়ে শুয়ে বা ইশারায় নামাজ পড়া যায়। দ্বিতীয়ত, যদি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্যালাইন বা ড্রিপ লাগানো থাকে এবং পানি ব্যবহার করা কষ্টসাধ্য হয়, তবে পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তায়াম্মুম করার সুযোগ রয়েছে। মাটি, ইট বা ধুলাযুক্ত কোনো বস্তুর ওপর হাত স্পর্শ করে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করা যথেষ্ট।
বিশেষ ক্ষেত্রে, যদি প্রসবযন্ত্রণা চরম সীমায় পৌঁছায় অথবা সিজারিয়ান সেকশনের জন্য অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করা হয়, তবে সেই সময়কালীন সমস্ত ধর্মীয় দায়িত্ব স্থগিত হয়ে যায়। হাদিসের আলোকে অজ্ঞান ব্যক্তির ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়, অর্থাৎ জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত তিনি দায়মুক্ত থাকেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর যদি দেখা যায় সন্তান জন্ম নিয়েছে, তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে 'নেফাস' অবস্থায় প্রবেশ করেছেন। এমতাবস্থায়, অজ্ঞান থাকা অবস্থায় ছুটে যাওয়া নামাজের কোনো কাজা আদায়ের প্রয়োজন হবে না।




