হিজরি ১৩ সনের জমাদিউস সানি মাস। মাত্র দুই বছর তিন মাসের শাসনামলে গৃহযুদ্ধ ও ধর্মত্যাগের ঝড় থামিয়ে স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলার পর প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন। তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, তাঁর জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু এই নবীন রাষ্ট্রের দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে? আরবের গোত্রপ্রীতি ও রাজনৈতিক অনৈক্যের আগুন যেটি তিনি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, নেতৃত্বের শূন্যতা সেটি পুনরায় প্রজ্বলিত করতে পারে কি না—এই চিন্তা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, মদিনায় আরও অনেক প্রবীণ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাহাবি থাকতে কেন তিনি ওমরের মতো তীব্র ব্যক্তিত্বকে বেছে নিলেন? এমনকি তাঁর নিজের সন্তানরাও তখন মদিনায় উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু তিনি নিজ পরিবার বা গোত্রের কাউকে উত্তরাধিকারী করেননি। যোগ্যতার অগ্রাধিকারই ছিল তাঁর বিবেচনার মূল ভিত্তি।

আবু বকর ছিলেন কোরাইশের বনু তাইম গোত্রের সদস্য, আর ওমরের শেকড় ছিল বনু আদি গোত্রে। তাদের মধ্যে নিকটাত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক ছিল না, যা ক্ষমতা হস্তান্তরকে স্বাভাবিক মনে করাতে পারে। ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, পরবর্তীকালের রাজতান্ত্রিক 'যুবরাজ প্রথা'র সঙ্গে আবু বকরের সিদ্ধান্তের কোনো মিল নেই। এটি ছিল সংকটকালে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তায় সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। (মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন আর-রায়িস, আন-নাজারিইয়াতুস সিয়াসিয়্যাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১২)

ওমরকে 'সাহেবে ওহুদ' বলা হতো। তাঁর ব্যক্তিত্বের কঠোরতা নিয়ে অনেকের সংশয় ছিল, কিন্তু আবু বকর জানতেন এই তেজ ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার শক্তি। রাসুল (সা.) মক্কার সংকটে দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, আবু জাহেল কিংবা ওমর ইবনুল খাত্তাব—এই দুজনের মধ্যে যে আপনার কাছে অধিক প্রিয়, তাকে দিয়ে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।' (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৮১) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, 'ওমর যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেছেন, সেদিন থেকেই আমরা সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছি।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৮৪) আবু বকর নিশ্চিত ছিলেন, পারস্য ও রোমের মতো আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলায় ওমরের মতো দৃঢ়চেতা আর দ্বিতীয় কেউ নেই।

ওমরের প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল বিরল। মদিনার দশ বছরে এমন অনেক সংকট এসেছে, যেখানে তাঁর পরামর্শ কোরআনের আয়াত দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। তিনি বলতেন, 'আমার প্রতিপালকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমার মতামত তিনটি বিষয়ে মিলে গিয়েছিল: মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান নির্ধারণ, পর্দার বিধান এবং রাসুলের স্ত্রীদের ব্যাপারে সতর্কতা।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০২) রাসুল (সা.) জানিয়ে গিয়েছিলেন, 'তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে এমন প্রজ্ঞাবান মানুষ ছিলেন, যাঁদের অন্তরে সত্যের অনুপ্রেরণা আসত; আমার এই উম্মতের মধ্যে যদি তেমন কেউ থাকে, তবে সে ওমর।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৮৯)

আবু বকরের পুরো শাসনামলে ওমর ছিলেন তাঁর প্রধান পরামর্শক। তিনি জনস্বার্থে খলিফার সামনে দ্বিমত পোষণ করতেও পিছপা হতেন না। স্বধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তে ওমর শুরুতে বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু আবু বকরের যুক্তি শুনে তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি যখন দেখলাম আল্লাহ আবু বকরের অন্তরকে এই সিদ্ধান্তের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তখন বুঝলাম এটিই সত্য।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪০০)

আবু বকর অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে তিনি ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা যেন নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে নেতা বানান। কিন্তু সাহাবিরা বিভেদের আশঙ্কায় খলিফার প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রেখে তাঁকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেন। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ৩০/৪১২) জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার পর তিনি মদিনার শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ পরামর্শ করেন। প্রথমে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মতামত নেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আপনি তাঁর সম্পর্কে যতটা উচ্চ ধারণা পোষণ করেন, তিনি বাস্তবে তার চেয়েও বেশি যোগ্য; তবে তাঁর মেজাজে কিছুটা কঠোরতা রয়েছে।' আবু বকর তখন দূরদর্শী জবাব দেন, 'ওমর মূলত আমাকে নরম মনের মানুষ দেখে নিজে কঠোর ভূমিকা পালন করে; কিন্তু যখন নেতৃত্বের দায়ভার তাঁর কাঁধে আসবে, তখন তিনি নিজেই নমনীয় ও ধৈর্যশীল হয়ে যাবেন।' এরপর ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর মতামত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, 'ওমরের বাইরের চেয়ে তাঁর ভেতরের রূপ আরও সুন্দর; আমাদের মাঝে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।' (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৯৯) আনসার ও মুহাজিরদের শীর্ষ প্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ আস্থার পর আবু বকর চূড়ান্ত দলিল প্রস্তুত করেন। আলি তানতাবি লিখেছেন, 'ওমরের এই মনোনয়ন কোনো স্বৈরতান্ত্রিক ফরমান ছিল না; বরং তা পরিচালিত হয়েছিল শুরার সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে।' (আত-তানতাবি, আবু বকর আস-সিদ্দিক, পৃষ্ঠা: ২৫০)

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আবু বকর প্রমাণ করেন যে, ইসলামি রাষ্ট্রে ক্ষমতা হস্তান্তর রক্তের সম্পর্ক নয়, যোগ্যতা ও শুরার ভিত্তিতে হয়। ওমরের আমানত ও দায়িত্ববোধ ছিল তাঁর নির্বাচনের মূল কারণ।