বায়োটেকনোলজির বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের তৈরি টিস্যু প্রতিস্থাপন করে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন গবেষকরা। বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং অটিজম, সিজোফ্রেনিয়া, মৃগী রোগ ও সেরিব্রাল পালসির মতো জটিল স্নায়বিক ব্যাধিগুলোর কার্যপদ্ধতি গভীরভাবে বোঝা। যেহেতু নৈতিক কারণে জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু সরাসরি গবেষণায় ব্যবহার করা সম্ভব নয়, তাই এই বিকল্প পদ্ধতিটি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান পরিচালক সের্জিউ পাসকা জানান, এই পদ্ধতির ফলে জিনগত পরিবর্তন, একক কোষের বৈশিষ্ট্য এবং স্নায়ু সার্কিটের কার্যকরী প্রভাব বিভিন্ন স্তরে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জানা যাবে যে, মানব জেনেটিক পরিবর্তনের ফলে স্নায়ু বিকাশে কী ধরনের প্রভাব পড়ে এবং তা প্রতিরোধ করার কোনো চিকিৎসা সম্ভব কি না।

গবেষণার প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা প্রথমে ত্বক বা রক্তের কোষকে রিপ্রোগ্রাম করে স্টেম কোষে রূপান্তর করেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে ত্রিমাত্রিক ক্ষুদ্রাকার ‘অর্গানয়েড’ তৈরি করা হয়, যা মানুষের সেরিপ্রাল কর্টেক্সের প্রধান কোষ ও বিকাশের বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করে। এই সেরিপ্রাল কর্টেক্স অংশটি মানুষের প্রজ্ঞা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ এবং ভাষার মতো উচ্চতর কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, ইঁদুরগুলোকে এমনভাবে জিনগতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল যাতে তাদের নিজস্ব সেরিপ্রাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাসের কোষগুলো প্রায় অনুপস্থিত থাকে। এর ফলে জন্মের পরপরই মানব কর্টিকাল অর্গানয়েড প্রতিস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয় এবং তা সফলভাবে কার্যকরী নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠন করতে পারে।

এই প্রতিস্থাপিত টিস্যুর মধ্যে ‘ভন ইকোনোম নিউরন’ নামক এক বিরল কোষ পাওয়া গেছে, যা ডিমেনশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু রূপের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে গবেষকরা এই প্রাণীদের নামকরণের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। পাসকা স্পষ্ট করেন যে, এদের ‘মানব মস্তিষ্কওয়ালা ইঁদুর’ বা ‘হিউম্যানাইজড ইঁদুর’ বলা সঠিক নয়, কারণ তাদের নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র বজায় থাকে। পরিবর্তে তারা এদের ‘জেনোকর্টিক্যাল’ ইঁদুর হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মূলত বাইরের থেকে প্রতিস্থাপিত মানব কর্টিকাল টিস্যুকে নির্দেশ করে। পাসকা আরও উল্লেখ করেন যে, এই অর্গানয়েডগুলো পূর্ণাঙ্গ মানব মস্তিষ্কের জটিলতা তৈরি করতে না পারলেও স্নায়ু কোষের বিকাশ গবেষণার এক অনন্য সুযোগ করে দিয়েছে।

এই মডেলটির কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য গবেষকরা ইঁদুরগুলোকে অক্সিজেনের স্বল্পতার মুখে ফেলেছিলেন। দেখা গেছে, ল্যাবরেটরির সাধারণ ইঁদুর যেখানে অক্সিজেনের অভাবে সহনশীল ছিল, সেখানে জেনোকর্টিক্যাল ইঁদুরের মানব কর্টিকাল কোষগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে তাদের হাঁটার ভঙ্গি এবং মোটর সমন্বয়ে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হয়েছে যে, গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাব কীভাবে সেরিব্রাল পালসি বা অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পুরো গবেষণাটি কঠোর নৈতিক নির্দেশিকা মেনে পরিচালিত হয়েছে। এখানে দুটি প্রধান বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—প্রথমত, প্রাণীদের কষ্ট সর্বনিম্ন রাখা এবং বিকল্প পথ না থাকলে তবেই তাদের ব্যবহার করা; দ্বিতীয়ত, মানব টিস্যুর প্রবর্তনের ফলে কোনো অপ্রত্যাশিত বা নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। জৈবিকভাবে প্রস্তুত এই ইঁদুরগুলো দেখতে সাধারণ ইঁদুরের মতোই হলেও তাদের স্মৃতিশক্তি এবং সূক্ষ্ম মোটর সমন্বয়ে কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। গবেষকদের মতে, প্রতি পাঁচজনে একজনের স্নায়বিক বা মানসিক সমস্যা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর চিকিৎসার অভাব রয়েছে, তাই এই ধরণের গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।