কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, সেটিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন প্রযুক্তি গবেষক ও উদ্যোক্তা সানি মো. আশরাফ খান। তাঁর বিশ্বাস, এআই-এর সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশের কর্মশক্তিকে প্রতিস্থাপিত করার পরিবর্তে আরও বেশি উৎপাদনশীল করে তুলবে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করা এবং ইনফ্রাটেক কনসালট্যান্টস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আশরাফ খান মনে করেন, প্রযুক্তির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এটি কেবল কাজ বিলুপ্ত করে না, বরং কাজের ধরন বদলে দেয়। তাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো দেশীয় জনশক্তিকে এআই-সক্ষম করে তোলা।

আশরাফ খানের মতে, 'এআই-সক্ষম জনশক্তি' মানে হলো এমন এক দক্ষ গোষ্ঠী যারা নিজেদের পেশায় এআই-কে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করবে। যেমন—একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিপণন ও হিসাবের জন্য বা একজন দর্জি পোশাকের নকশা তৈরিতে এআই ব্যবহার করতে পারেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ যদি দ্রুত তার তরুণ প্রজন্মকে এই নতুন দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারে, তবে এআই-সক্ষম মানবসম্পদ রপ্তানি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান সক্ষমতা। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই, অভাব কেবল সুযোগের। তিনি ইতোমধ্যে ৩২ হাজারেরও বেশি মানুষকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যার লক্ষ্য কেবল প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, বরং আয়ের পথ নিশ্চিত করা।

ভবিষ্যতের প্রযুক্তির কথা বলতে গিয়ে তিনি 'এজেন্টিক এআই' (Agentic AI)-এর ধারণাটি সামনে আনেন। বর্তমানে আমরা এআই-কে নির্দেশনা দিয়ে উত্তর পাই, কিন্তু পরবর্তী ধাপে এআই ব্যবহারকারীর অনুমতি ও নির্ধারিত সীমার মধ্যে সরাসরি কাজ সম্পাদন করবে। যেমন, ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে এআই কেবল তালিকা দেবে না, বরং ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী ফ্লাইট ও হোটেল বুকিংয়ের প্রক্রিয়াটি নিজেই এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই পরিবর্তনের ফলে মানুষের উৎপাদনশীলতার সংজ্ঞাই বদলে যাবে। তবে তিনি সতর্ক করেন, এআই-এর ঝুঁকি যেমন রয়েছে—ভুয়া তথ্য বা সাইবার অপরাধের মতো—তেমনি এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে গাড়ির ব্রেক বা ট্রাফিক আইনের মতো কঠোর আইনি ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করে।

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন তথ্যের চেয়ে তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতার মূল্য বেশি। তাই 'ডিগ্রির আগে দক্ষতা'—এই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ এবং বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয়তা আমাদের এমন এক সাশ্রয়ী ও ফলাফলমুখী শিক্ষা মডেল তৈরি করতে বাধ্য করবে, যা ভবিষ্যতে অন্য দেশে রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি যারা প্রথাগত শিক্ষায় পিছিয়ে আছেন, তাদের জন্যও এআই হবে এক নতুন সুযোগ, কারণ এটি দক্ষতা অর্জনের বাধা কমিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক নতুন দিগন্ত হিসেবে তিনি 'ভার্চ্যুয়াল রেমিট্যান্স'-এর কথা বলেন। এর মূল কথা হলো, মানুষ দেশ না ছেড়েই ডিজিটাল দক্ষতার মাধ্যমে বিদেশ থেকে আয় করবে। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত অনেক তরুণ ঘরে বসেই বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন সদস্যকে ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে যুক্ত করা। এর জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে ইন্টারনেট, সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল হাবের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

পরিশেষে, সানি মো. আশরাফ খান সরকার, শিল্প খাত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। সরকার যেন ডিজিটাল রেমিট্যান্সকে জাতীয় সক্ষমতা হিসেবে দেখে, শিল্প খাত যেন প্রশিক্ষণের নকশায় যুক্ত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় যেন বাস্তব প্রয়োগমুখী স্নাতক তৈরি করে। তাঁর স্বপ্ন হলো এমন এক এআই-সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা শুধু ভবিষ্যৎ আমদানি করবে না, বরং বিশ্বকে পথ দেখাবে।