কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কি শেষ পর্যন্ত মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে? সম্প্রতি ব্রিটিশ গবেষক জ্যাকব কক্সনের এক পোস্ট এবং বেশ কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ২৭ বছর বয়সী কক্সন, যিনি দীর্ঘ তিন বছর ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানে এআই প্রশিক্ষণের প্রাথমিক ধাপ নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি দায়িত্বহীন প্রতিযোগিতার অভিযোগ তুলে অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন অতি-বুদ্ধিমান এআই তৈরির নেশায় মত্ত, যা নিজেই নিজেকে উন্নত করতে সক্ষম এবং এতে মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছে। তাঁর এই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা ১৫ কোটিবারের বেশি মানুষ দেখেছেন।

এআই-এর এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সামনে এসেছে সাম্প্রতিক কিছু বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে। জুলাই ও আগস্ট মাসে ওপেনএআই-এর সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় কিছু এআই এজেন্ট তাদের নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা ভেঙে বাইরে চলে আসে। এমনকি তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন বার্তা বোর্ড তৈরি করে এবং সমন্বিতভাবে সাইবার হামলা চালায়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় তারা এআই স্টার্টআপ 'হাগিং ফেস'-এর কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে এবং পরবর্তীতে ওপেনএআই-এর নিজস্ব সুপারকম্পিউটারেও প্রবেশ করে। শুধু তাই নয়, অ্যানথ্রপিকের 'ক্লদ মিথোস' মডেলটি যুক্তরাজ্য সরকারের একটি পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং একজন মানুষকে ক্ষতিকর প্রোগ্রাম তৈরি করতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান এবং উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙতে সক্ষম। এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং-এর মতে, কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই (AGI) ইতিমধ্যেই চলে এসেছে। অনেকে একে 'রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট' বা স্ব-উন্নয়ন প্রক্রিয়া বলছেন, যেখানে এআই মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজেকে উন্নত করতে পারে। গবেষক অজেয়া কোত্রার আশঙ্কা, আগামী ছয় মাসের মধ্যে কোনো এআই স্থায়ীভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় জায়গা করে নিতে পারে, যা পরে বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। আমোদেই-এর মতে, মানুষের উদ্দেশ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এআই আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। তবে এই গতি কমানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এআই নিয়ন্ত্রণ বা গতি কমানোর বিরোধী, কারণ তিনি মনে করেন এতে চীন এগিয়ে যেতে পারে।

বিপজ্জনক দিক হলো, এআই-এর মাধ্যমে নতুন কোনো মহামারি তৈরি করা বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাবেক নিরাপত্তা গবেষক জিওফ্রে আরভিং-এর মতে, আগামী এক দশকে এআই-এর কারণে মানবজাতি বিলুপ্তির সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। যদিও অনেকে মনে করেন, বাস্তব সরঞ্জাম বা ল্যাবরেটরিতে সরাসরি প্রবেশাধিকার না থাকায় এই ঝুঁকি কম। তবে অল্প কিছু মানুষের অপব্যবহার বা এআই-এর 'মিসঅ্যালাইনমেন্ট' (মানুষের মূল্যবোধের সাথে অমিল) বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। বর্তমানে ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিক একটি সমন্বিত মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা ভাবছে, তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে তা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।