কাজের চাপে বা দীর্ঘ পড়াশোনার ফলে যখন মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং নতুন কোনো সৃজনশীল চিন্তা মাথায় আসে না, তখন সামান্য সময়ের বিরতি ও হালকা ঘুম সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে হাতের মুঠোয় কোনো বস্তু ধরে অল্প সময়ের জন্য ঘুমানোর কৌশলটি সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, টমাস এডিসন, নিকোলা টেসলা বা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো মেধাবীরা এমন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। তবে ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি এই অভ্যাসের নিয়মিত চর্চা করতেন। দালি তাঁর 'ফিফটি সিক্রেট অব ম্যাজিক ড্রাফটসম্যানশিপ' বইয়ে একটি বিশেষ কৌশলের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে শক্ত চেয়ারে বসে হাতে একটি ভারী চাবি ধরে নিচে একটি প্লেট রাখা হয়। ঘুমের ঘোরে হাত থেকে চাবিটি পড়ে গিয়ে শব্দ হলে তাঁর ঘুম ভেঙে যেত এবং সেই মুহূর্তের অবচেতন মনের ভাবনাগুলো তিনি ধরে রাখতে পারতেন।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান এই অদ্ভুত অভ্যাসের পেছনে যৌক্তিক কারণ খুঁজে পেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো ঘুমের প্রথম পর্যায়, যাকে বলা হয় 'এন১' (N1)। এটি নন-আরইএম (non-REM) ঘুমের সবচেয়ে হালকা ধাপ। এই স্তরে শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়ে আসে এবং মস্তিষ্ক সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাগুলো দিয়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন বা 'মাইক্রো-ড্রিম' তৈরি করে। এই পর্যায় থেকে জেগে উঠলে মানুষ প্রায়ই মনে করে যে তারা আসলে ঘুমাতেই পারেনি, কিন্তু এই অতি ক্ষুদ্র স্বপ্নগুলো জটিল দৃশ্যকল্প তৈরির মাধ্যমে সৃজনশীলতাকে উদ্দীপিত করে। গবেষকরা 'নারকোলেপ্সি' নামক ঘুমের ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর গবেষণায় দেখেছেন যে, তারা সাধারণ মানুষের তুলনায় সৃজনশীল পরীক্ষায় অধিক সফল হয়েছেন।

বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে গবেষকেরা একটি গাণিতিক পরীক্ষার আয়োজন করেন। অংশগ্রহণকারীদের একটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সংক্ষিপ্ত পথ বা শর্টকাট খুঁজে বের করতে বলা হয়। যারা ৩০ বারের চেষ্টাতেও সফল হননি, তাদের একটি অন্ধকার ঘরে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে দেওয়া হয় এবং হাতে একটি প্লাস্টিকের বোতল ধরিয়ে দেওয়া হয়। ফলাফল দেখা গেছে, যারা হালকা ঘুমের 'এন১' পর্যায়ে পৌঁছে বোতলটি হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ (২৪ জনের মধ্যে ২০ জন) সেই গোপন শর্টকাটটি খুঁজে পান। অন্যদিকে, যারা জেগে ছিলেন তাদের মাত্র ৩০ শতাংশ (৫৯ জনের মধ্যে ১৫ জন) সফল হন। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫ সেকেন্ড এই হালকা ঘুমে থাকলেও তা কার্যকর হয়, তবে গভীর ঘুমে চলে গেলে এই সুবিধা আর পাওয়া যায় না।

তবে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই কোনো জাদুকরী সমাধান পাওয়া যায় না; বরং সমাধান পেতে এরপর আরও কিছু চেষ্টা করতে হয়। এন১ পর্যায় থেকে জেগে ওঠার পর মস্তিষ্ক কেন হঠাৎ করে অধিক সক্রিয় ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে, তা এখনো পুরোপুরি রহস্য। বর্তমানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-এর গবেষকরা এই রহস্য উদঘাটনে কাজ করে যাচ্ছেন।