মানুষের শরীরবৃত্তীয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো হাঁচি, যার মাধ্যমে শ্বাসনালির ক্ষতিকর জীবাণু ও ধূলিকণা শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে স্বস্তির বিষয় মনে করা হলেও, ইসলামে হাঁচির প্রকাশভঙ্গিকে শালীন ও নিয়ন্ত্রিত রাখার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। নবীজি (সা.) হাঁচির সময় নিজের হাত অথবা পরিধেয় কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিতেন এবং শব্দ নিচু ও সংযত রাখতেন, যাতে অন্যের অসুবিধা না হয় এবং জীবাণু ছড়িয়ে না পড়ে। ইসলামে হাঁচিকে আল্লাহর ভালোবাসা ও অনুগ্রহের প্রতীক মনে করা হয়, যেখানে হাই তোলাকে শয়তানের প্রভাব হিসেবে সতর্ক করা হয়েছে।
হাঁচি দেওয়ার পর মুমিনের করণীয় ও পারস্পরিক শিষ্টাচার নিয়ে রাসুল (সা.) সাতটি বিশেষ আদব শিখিয়েছেন। প্রথমত, হাঁচি আসার পর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যেহেতু হাঁচি মানুষের ইচ্ছাধীন নয়, তাই এর পর স্বেচ্ছায় 'আলহামদুলিল্লাহ' (সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য) বলা উচিত। এর মাধ্যমে পার্থিব স্বস্তিকে ইবাদতে পরিণত করা যায়। দ্বিতীয়ত, হাঁচিদাতা আলহামদুলিল্লাহ বললে পাশে থাকা সঙ্গীর জন্য তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' (আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন) বলা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বা প্রায় বাধ্যতামূলক। একে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। তৃতীয়ত, রহমতের দোয়ার জবাবে হাঁচিদাতার উচিত পুনরায় কল্যাণের দোয়া করা। এক্ষেত্রে 'ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বালাকুম' (আল্লাহ তোমাদের হেদায়েত দান করুন এবং তোমাদের সার্বিক অবস্থা সংশোধন করে দিন) বলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এভাবে তিনটি দোয়ার মাধ্যমে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়।
চতুর্থ আদব হলো, কেবল আলহামদুলিল্লাহ বললেই কেবল তার জবাব দেওয়া। রাসুল (সা.)-এর মজলিসের একটি ঘটনার উল্লেখ আছে, যেখানে একজন আলহামদুলিল্লাহ না বলায় নবীজি তার হাঁচির জবাব দেননি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করলে অন্যের দোয়ার হক পাওয়া যায় না। পঞ্চমত, ক্রমাগত হাঁচির ক্ষেত্রে একটি সীমা নির্ধারিত করা হয়েছে। তিনবার পর্যন্ত হাঁচি দিলে জবাব দেওয়া আবশ্যক, তবে তার বেশি হলে তাকে অসুস্থ বা সর্দিগ্রস্ত হিসেবে গণ্য করে আরোগ্যের দোয়া করা যেতে পারে, নিয়মিত জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
ষষ্ঠত, অমুসলিমদের প্রতি মানবিক আচরণের শিক্ষা। মদিনার ইহুদিরা যখন নবীজির সামনে হাঁচি দিত, তিনি তাদের রহমতের পরিবর্তে হেদায়েত ও সংশোধনের দোয়া করতেন, যা অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ নয় বরং আন্তরিক শুভকামনার বহিঃপ্রকাশ। সবশেষে, নামাজের ভেতরের বিধান। নামাজের সময় অন্য কারো হাঁচির জবাবে কথা বলা বা 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা নিষিদ্ধ, কারণ এতে নামাজ ভেঙে যেতে পারে। নামাজে কেবল তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন পাঠের অনুমতি রয়েছে। তবে নামাজরত অবস্থায় নিজের হাঁচি এলে মুখ ঢেকে নেওয়া সুন্নত এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে 'আলহামদুলিল্লাহ' বেরিয়ে গেলে নামাজ নষ্ট হয় না।




