মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশপথে মনু নদের তীরে অবস্থিত পশ্চিম বাজার বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের এই বাজারটি একসময় ছিল একটি সাধারণ গ্রামীণ হাট, যা এখন আধুনিক রেমিট্যান্স-নির্ভর ব্যবসায়িক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস এবং ব্যবসায়িক তথ্যানুসারে, ১৮১০ সালে জমিদার মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ এই বাজারের ভিত্তি স্থাপন করেন। সেই সময়ে সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসত এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল ও মাছ নিয়ে আসতেন। 당시 ইজারাদাররা বিক্রেতাদের কাছ থেকে 'তুলা' নামক এক ধরনের কর আদায় করতেন, যা ছিল সেই সময়ের আয়ের প্রধান উৎস।

নৌপথের বাণিজ্যের এক সোনালি অধ্যায় ছিল এই বাজারের ইতিহাসে। মনুমুখ লঞ্চঘাটের মাধ্যমে কুশিয়ারা নদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ এবং ভারতের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সাথে পণ্য আদান-প্রদান করা হতো। বিশেষ করে 'সোনালি আঁশ' পাটের ব্যাপক ব্যবসার ফলে এই এলাকা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল। এছাড়া রাজকান্দি ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি কাঠ সংগ্রহ করে তা নৌপথে পাঠানো হতো, যা তৎকালীন অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ ছিল। তবে ১৯৮৯ সালে বনজ সম্পদ কাটার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌ-বাণিজ্য ও কাঠের ব্যবসার পতন ঘটে।

বর্তমানের পশ্চিম বাজার আর কেবল কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ইউরোপ ও আমেরিকায় গ্রীষ্ম ও শীতকালীন ছুটির সময় যখন প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফেরেন, তখন এই বাজারের বিক্রি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রবাসীদের রুচি ও ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে এখানকার দোকানগুলোর সাজসজ্জা এখন ইউরোপীয় বিপণিবিতানের আদলে আধুনিক করা হয়েছে। কসমেটিকস ও পোশাক ব্যবসায়ীদের মতে, প্রবাসীরাই এখন এই বাজারের প্রধান গ্রাহক। এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে এখানে এক্সিম ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকসহ প্রায় সব প্রধান ব্যাংকের শাখা এবং বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস গড়ে উঠেছে। স্থানীয় তথ্যমতে, এই বাজারের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ বর্তমানে দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যদিও বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ব্যবসায় কিছুটা মন্দা দেখা দিয়েছে।

তবে আধুনিকতার পাশাপাশি এখানে কিছু ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখনো টিকে আছে। বিশেষ করে মেহগনি ও সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি হারমোনিয়ামের মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা এবং বেতের ফার্নিচারের কারুকাজ এখনো শৌখিন ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। তবে কাঁচামালের অভাব এবং প্লাস্টিকের আসবাবের ভিড়ে এই কুটিরশিল্পগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে একসময় স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও এখন কলা ও পানের মতো পণ্যের জন্য এই বাজার রাজশাহী ও বরিশালের ওপর নির্ভরশীল। মাছের বাজারেও এখন প্রাকৃতিক মাছের চেয়ে বাণিজ্যিক খামারের মাছের আধিক্য বেশি।

এতসব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। শহরের সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং বিসিক শিল্প এলাকার অব্যবস্থাপনা ব্যবসার প্রসারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালবাহী ট্রাক চলাচলে সমস্যার কারণে পরিবহন খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামের ওপর। সামগ্রিকভাবে, জমিদারদের কর আদায়ের হাট থেকে শুরু হয়ে বর্তমানের এই আধুনিক রূপান্তর মৌলভীবাজারের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। সঠিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা হলে এই বাজার আগামীতে আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।