তৈরি পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই মাসে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে, তবে এর ফলে কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যায়নি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য দেন। বাটেক্সপো আয়োজন, নতুন বাজার ও ক্রেতা খোঁজা এবং পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গত সাত দিনের তুলনায় বর্তমানে কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, হঠাৎ কোনো অভিঘাতে কারখানা বন্ধ হয়ে যায় না; এতে ছয় মাসের মতো সময় লাগে। ক্রয়াদেশ ও শ্রমিকের বেতনের বিষয় জড়িত থাকায় দুই মাসের জ্বালানিসংকটে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। এই সংকটের প্রভাব মূল্যায়ন করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এক বছর আগের কোনো অভিঘাতের কারণে যদি কোনো কারখানা বন্ধ হয়, তবে সেটিকে বর্তমান পরিস্থিতির ফল হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না বলেও জানান তিনি। কারখানা বন্ধ হওয়া এবং নতুন কারখানা চালু হওয়াকে তিনি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন।
জ্বালানি সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাস সাশ্রয় করে তা কারখানায় সরবরাহের প্রস্তাবও দেন তিনি।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি ৫ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান মাহমুদ হাসান খান। তবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, আগস্টে আগের বছরের রপ্তানি তুলনামূলক কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখা যাচ্ছে। গত তিন বছরে পোশাক ব্যবসায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ, জাহাজ চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা পোশাকশিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এক যুগের বেশি সময় পর আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাটেক্সপো আয়োজন করতে যাচ্ছে বিজিএমইএ। নতুন ক্রেতা ও বাজার খোঁজার পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পরিবর্তন, উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরতে এই আয়োজন কাজে লাগাতে চায় সংগঠনটি। এবারের বাটেক্সপোতে ‘গ্লোবাল অ্যাপারেল এক্সপো’, ‘গ্লোবাল অ্যাপারেল সামিট’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবন হাব, টেকসই ও চক্রাকার অর্থনীতির প্রদর্শনী, টেকসই নেতৃত্ব পুরস্কার ও ফ্যাশন রানওয়ের আয়োজন থাকবে।
বর্তমানে বিশ্বের ১৬৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হচ্ছে জানিয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অংশীদারত্ব বাড়াতে ‘জাপান মার্কেট স্ট্র্যাটেজি কমিটি’ কাজ করছে। জাপানি ব্র্যান্ড ও বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বিজিএমইএ কার্যালয়ে ‘বিজিএমইএ-জাপান ডেস্ক’ চালু হচ্ছে, যা ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত উদ্বোধন করবেন।
নতুন বাজার ও ক্রেতা খোঁজার উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী ২৮ ও ২৯ অক্টোবর হংকংয়ে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল রোড শো, হংকং ২০২৬’ আয়োজন করা হবে। বিজিএমইএ ও এইচএসবিসি বাংলাদেশ যৌথভাবে এই আয়োজন করবে। হংকংয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। বিশেষ করে যেসব ব্র্যান্ড ও ক্রেতা এখনো বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন না, তাঁদের লক্ষ্য করেই এই রোড শো আয়োজন করা হচ্ছে।
ব্যবসার খরচ ও পণ্য সরবরাহে সময় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে কাস্টমস ও বন্ড-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, কাস্টমসের হয়রানি থেকে এখনো পুরোপুরি উত্তরণ হয়নি। তবে প্রক্রিয়া চলছে এবং অনেক কার্যক্রম ডিজিটাল করা হচ্ছে। বন্ড অডিটের জন্য দেশের পেশাদার নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তর্ভুক্ত করে স্থায়ী নীতিমালা করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি করা পণ্যের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক স্থায়ী কার্গো শেড নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।
পোশাকশ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জায়গা চেয়েছে বিজিএমইএ। এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার কথা জানান সংগঠনটির সভাপতি। আগামী বছরের শুরুতে প্রায় ১০০ শয্যার মিরপুর হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য কাজ চলছে বলেও তিনি জানান। পোশাক রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট কমাতে নগদ সহায়তার বিপরীতে প্রযোজ্য ৫ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি বলেন, এই কর প্রত্যাহার করা না হলে তা চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।




