দেশজুড়ে করপোরেট ও বহুজাতিক ব্র্যান্ডের আগ্রাসন থাকলেও মৌলভীবাজার জেলা শহরের বেকারি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য এখনো অটুট। নদীতীরের এই শহরের বাতাসে যেন সব সময় মিষ্টি ও তাজা বেকারি পণ্যের সুবাস লেগে থাকে। সেখানকার বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজেদের দখলে রেখেছে স্থানীয় উদ্যোক্তারা, যা দেশের অন্য জেলার জন্য অনুকরণীয় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।
বাজারের বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ, দখল করে আছে বৃহৎ স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো। বেঙ্গল ফুড, স্বাদ অ্যান্ড কোং ও পিউরিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত মান, ড্রাই কেক, মুচমুচে বিস্কুট ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে সব শ্রেণির ক্রেতার আস্থা অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি আরও ২০ শতাংশ বাজার রয়েছে রাজমহল সুইটস, মহানগর ও রহমান সুইট মার্টের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে। খাঁটি ছানার মিষ্টি, দই এবং বিয়ে বা যেকোনো উৎসবের বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণ থেকে অভিজাত ক্রেতাদের কাছেই জনপ্রিয়। বাকি অংশে টেস্টি ট্রিট, মিঠাই ও বনফুলের মতো আধুনিক করপোরেট চেইন শপগুলো শহুরে তরুণ প্রজন্মের কাছে বার্থডে কেক, প্যাকেটজাত পণ্য ও ফাস্ট ফুডের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই নিজস্ব মান ও ক্রেতাদের অবিচল আস্থার কারণে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে ‘স্বাদ অ্যান্ড কোং’। ২০০৫ সালে পশ্চিম বাজারে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এখন জেলার শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে জেলাজুড়ে তাদের ১৮টি আউটলেট রয়েছে, যা মানসম্মত খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই ব্যবসায়ী পরিবারের ঐতিহ্য অবশ্য অনেক পুরোনো। পাকিস্তান আমলে স্থানীয় বাজারে তাদের মনিহারি ও পেট্রোলিয়ামের ব্যবসা ছিল। পরে প্রতিষ্ঠাতা গিয়াস আহমেদ চৌধুরী কুয়েতে ব্যবসা শুরু করলেও উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ১৯৯৮ সালে দেশে সুপারশপ চালু করার পর ২০০৫ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে তিনি বেকারি ব্যবসায় প্রবেশ করেন। এখন সেই উদ্যোগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তার ছেলে জাহেদ আহমেদ চৌধুরী।
প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে তৈরি প্রিমিয়াম মানের বেকারি পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে স্বাদ ঘি, রসমালাই, লাল মোহন, মালাইকারি, চমচম, ছানার পায়েস, লাড্ডু, ড্রাই কেক, বাদামি বিস্কুট, ক্রিস্পি টোস্ট ও পেস্ট্রি। আধুনিক কনফেকশনারি হিসেবে আউটলেটগুলোতে এখন জুস, লাচ্ছি, শর্মা, স্মোকিং স্যান্ডউইচ ও বার্গারও পাওয়া যায়।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি এ গ্রেড সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে। কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভমুক্ত খাবার সরবরাহের পাশাপাশি নির্ধারিত গোয়ালার কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়। সম্পূর্ণ হালাল খাবারের এই প্রতিষ্ঠানে পবিত্র রমজান মাসে ক্রেতাদের চাহিদার ভিত্তিতে বিফ বিরিয়ানি বিক্রি করা হয়। সেবার মান ও সততার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি কয়েকবার জেলায় শ্রেষ্ঠ ভ্যাট প্রদানকারী নির্বাচিত হয়েছে।
খাদ্য ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে পর্যটন খাতেও বড় ভূমিকা রাখছে এই পরিবার। মৌলভীবাজারে ১১ একর জায়গার ওপর প্রবাসীদের সঙ্গে যৌথভাবে তারা গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম ‘বার্ড পার্ক ও রিসোর্ট’।




