বাংলার ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের অন্যতম নিদর্শন বেতের তৈরি আসবাব। একসময় ধনাঢ্য কিংবা মধ্যবিত্ত—যেকোনো পরিবারের বসার ঘরের সৌন্দর্য প্রকাশ পেত কাঁচা বেতের ঘ্রাণ ও বাঁকানো নকশায়। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই এই শিল্পের বাজার পুরো বৃহত্তর সিলেটজুড়ে ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে মানুষের জীবনযাত্রা ও পছন্দ বদলে যাওয়ায় মেটাল, প্লাস্টিক আর পারটেক্স বোর্ডের কৃত্রিমতার ভিড়ে সেই শতবর্ষী ঐতিহ্য এখন কোণঠাসা।

মৌলভীবাজার শহরের ঐতিহাসিক 'পশ্চিম বাজারে' একসময় বেতের পণ্যের যে জমজমাট ব্যবসা ছিল, তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে এখন কেবল একটিমাত্র দোকানে ঠেকেছে। 'শিফা কেইন ফার্নিচার' নামের ওই ছোট্ট দোকানটিতে এখনো মেলে চমৎকার কারুকার্যময় পরিবেশবান্ধব বেতের সোফাসেট, হেলান দেওয়ার আরামদায়ক চেয়ার, ঝুলন্ত দোলনা, বৈচিত্র্যময় মোড়া এবং গৃহসজ্জার নান্দনিক উপকরণ।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শাহিন মিয়া জানান, আগের মতো সাধারণ ক্রেতারা আর আসেন না। এখন মূলত শৌখিন মানুষ এবং ছুটি কাটাতে দেশে ফেরা প্রবাসীরাই এই পণ্য কেনেন। প্রবাসে থাকাকালীন নিজেদের ঘরের অন্দরমহলে দেশীয় ঐতিহ্যের উষ্ণতা ও নান্দনিকতা ধরে রাখতে তাঁরা বেতের আসবাব সংগ্রহ করেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইন অর্ডার নিয়ে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।

তবে এই সীমিত আগ্রহে শতবর্ষী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে এই কুটিরশিল্প বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। স্থানীয়ভাবে বা বনাঞ্চলে আগের মতো মানসম্মত বেত পাওয়া যায় না। চড়া দামে বাইরে থেকে কাঁচামাল কিনে আনতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে সস্তায় মিলে যাওয়া প্লাস্টিক বা মেটালের আসবাবের সঙ্গে মূল্যের প্রতিযোগিতায় শতভাগ হাতে তৈরি এই বেতশিল্প কোনোভাবেই পেরে উঠছে না।

এসব সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে দক্ষ কারিগরের চরম সংকট। এই কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য হলেও সে অনুযায়ী ন্যায্য মজুরি মেলে না। কাজের নিশ্চয়তাও নেই। তাই অনেক অভিজ্ঞ কারিগর বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার শতবর্ষী এই পেশা ছেড়ে দিনমজুরি বা অন্য পেশায় চলে গেছেন। কারিগরের অভাবে অনেক মালিকই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে পুরো অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী পশ্চিম বাজারের সেই গৌরবময় ইতিহাস এখন শুধুই স্মৃতি।