প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান এইচপি (HP) বর্তমানে এশিয়ার বাজারে তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে নতুন পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের বদলে ব্যবহারকারীর ডিভাইসেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিচালনার সক্ষমতা সম্পন্ন 'এআই পিসি' (AI PC)-কে নতুন প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। এইচপির গ্রেটার এশিয়া অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাইকেল বয়েল মনে করেন, এআই পিসি ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো তৃতীয় পক্ষের এআই প্রোভাইডারদের উচ্চমূল্যের 'টোকেন কস্ট' থেকে মুক্তি পাবে এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।
এইচপির এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে। সেখানে বর্তমানে এমন এক সাউন্ডট্র্যাক বাজছে যা কোনো নির্দিষ্ট অ্যালবাম বা প্লেলিস্ট থেকে নয়, বরং রিয়েল-টাইমে একটি এআই প্রোগ্রাম দ্বারা তৈরি হচ্ছে। Wubble AI নামক একটি স্টার্টআপ এই প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে, যারা এইচপির 'গ্যারেজ ২.০' (Garage 2.0) এক্সিলারেটর প্রোগ্রামের অংশ ছিল। আবহাওয়া বা বিমানবন্দরের ভিড়ের ওপর ভিত্তি করে এই এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগীতের সুর পরিবর্তন করতে পারে। বয়েল জানান, বড় প্রতিষ্ঠানের জটিলতার বাইরে ছোট স্টার্টআপগুলোর দ্রুত উদ্ভাবনী ক্ষমতা তাদের অনুপ্রাণিত করে।
দীর্ঘদিন ধরে এইচপি তাদের প্রিন্টারের জন্য পরিচিত হলেও, বর্তমান যুগেও তারা এই খাতের সম্ভাবনাতে বিশ্বাসী। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রিন্টিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এখনো অপরিবর্তিত। সম্প্রতি তারা মাইক্রোসফট কো-পাইলট (Microsoft Copilot) সংবলিত এআই প্রিন্টার বাজারে এনেছে, যা ল্যাপটপ চালু না করেই ক্লাউড থেকে নথি প্রিন্ট করতে পারে এবং স্ক্যান করা ডকুমেন্টের এআই সামারি তৈরি করতে সক্ষম। তবে সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে বিশেষ করে চীনে চাহিদার ঘাটতির কারণে তাদের প্রিন্টিং রাজস্ব ২.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে এইচপি এখন এআই পিসির দিকে ঝুঁকছে। ২০২৪ সালে তারা OmniBook X এবং EliteBook Ultra-র মতো এআই ল্যাপটপ উন্মোচন করেছে। অন্তর্বর্তী সিইও ব্রুস ব্রোসার্ড আশা করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ কোম্পানির মোট শিপমেন্টের ৫০ শতাংশই হবে এআই পিসি। সাধারণ পিসির তুলনায় এই ডিভাইসগুলোর দাম ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি, কারণ এতে বিল্ট-ইন নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট (NPU) থাকে। এর ফলে নেটওয়ার্ক বিলম্ব (latency) কমে এবং ডেটা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে বলে নিরাপত্তা বাড়ে। এ ধারাবাহিকতায় তারা 'এইচপি আইকিউ' (HP IQ) নামে একটি ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টও চালু করেছে যা সম্পূর্ণ ডিভাইসের ভেতরেই কাজ করে।
তবে এই অগ্রযাত্রায় কিছু বাধা রয়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই-কে কেবল একটি ফিচার হিসেবে যোগ না করে ব্যবসার মূল কাঠামোর অংশ করতে হবে। এছাড়া অ্যাপল, ডেল বা লেনোভোর মতো প্রতিযোগীদের ভিড়ে নিজস্ব বিশেষ প্রযুক্তি ছাড়া মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বয়েল স্বীকার করেছেন যে, জাপানের মতো রক্ষণশীল বাজারগুলোতে এই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা আসতে কিছুটা সময় লাগছে।
এইচপির এশীয় যাত্রার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৬৯ সালে সিঙ্গাপুরে প্রথম আঞ্চলিক অফিস খোলার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতে তাদের উৎপাদন ও সেবা কেন্দ্র বিস্তার করেছে। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে তাদের মোট রাজস্বের ২৫ শতাংশেরও বেশি এসেছে এই এশীয় অঞ্চল থেকে। বয়েল, যিনি ২০১৫ সালে এই সংস্থায় যোগ দেন, এশিয়ার বৈচিত্র্যময় বাজার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুখোমুখি বিক্রয় পদ্ধতি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অনলাইন বাজারের পার্থক্যের প্রশংসা করেন।



