দেশে কৃষিযন্ত্রের বাজার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার, যার মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ৭০০ কোটি টাকার। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। এই খাতে ছোট-বড় প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। দিনাজপুরের কালীতলায় অবস্থিত উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম, যা কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে আমদানি বিকল্প হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় প্রবেশ করলেই দেখা যায় শ্রমিকদের ব্যস্ততা। কেউ লোহার পাত পেটাচ্ছেন, কেউ ঝালাইয়ের কাজ করছেন, কেউ চাকা লাগাচ্ছেন, আবার কেউ যন্ত্রের বডি তৈরি করছেন। শেডের ভেতরে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মেশিনে স্টিলের পাত কাটা ও জোড়া লাগানো হচ্ছে, বাইরে চলছে নতুন যন্ত্রের পরীক্ষামূলক চালনা। দক্ষ হাতে নানা ধরনের কৃষিযন্ত্র তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে।
উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক অমিতাভ পাল জানান, ১৯৯১ সালে একটি ছোট্ট ওয়ার্কশপ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে নামে প্রতিষ্ঠানটি। তখন বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১০ লাখ টাকা, যা এখন প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে ধান ও ভুট্টা মাড়াই, ধান থেকে চাল তৈরি, শর্ষে ভাঙানো, আলু উত্তোলন এবং ছোট সিডারসহ ৫১ ধরনের যন্ত্র তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এখানে কর্মরত রয়েছেন ১০০ জনের বেশি শ্রমিক। বছরে আড়াই হাজারের বেশি কৃষিযন্ত্র উৎপাদন করা হয়।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকার ও মডেলের যন্ত্র তৈরি করা হয়। উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে এখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও এসব যন্ত্র যাচ্ছে। বিশেষ করে বরগুনা ও পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় এলাকায় চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সারা দেশে উত্তরণের ১০টি নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফেদ উল ইসলাম বলেন, তাঁরা আমদানি বিকল্প কৃষিযন্ত্র তৈরি করছেন। আমদানি করা একটি যন্ত্রের দাম যেখানে ৫০ হাজার টাকা, সেখানে একই যন্ত্র তাঁরা ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। সঙ্গে দেওয়া হয় বিক্রয়োত্তর রক্ষণাবেক্ষণ সেবা। তিনি বলেন, “দামে কম এবং মানে ভালো হওয়ায় আমাদের যন্ত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।”
ধরনভেদে উত্তরণের কৃষিযন্ত্র ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। বছরে ৫০ কোটি টাকার বেশি যন্ত্র বিক্রি হয়। শক্ত স্টিল ব্যবহারের কারণে চীন থেকে আমদানি করা অনেক যন্ত্রের তুলনায় এগুলো বেশি টেকসই ও মজবুত বলে দাবি প্রতিষ্ঠানের। আধুনিক লেজার কাটিং মেশিন যুক্ত হওয়ার পর যন্ত্রের মান ও ফিনিশিং উন্নত হয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী ১০ বছরে দেশে কৃষিযন্ত্রের মোট চাহিদার অন্তত ৫০ শতাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় তাঁরা। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারি নীতিসহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
উত্তরণের তৈরি কৃষিযন্ত্রকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে। দিনাজপুরের সবুর মিয়া তেমনই একজন। তিনি ধান মাড়াইয়ের একটি যন্ত্র কেনার জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে কারখানায় এসেছিলেন। প্রতি ৫০ শতাংশ জমির ধান মাড়াইয়ের জন্য তিনি ১ হাজার ২০০ টাকা নেন। দিনাজপুর, নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সবুর মিয়ার মতো অনেকেই মৌসুমে যন্ত্র নিয়ে মাঠে গিয়ে ধান মাড়াই করেন। ফলে কৃষকদের আর ধান নিয়ে অন্য কোথাও যেতে হয় না; উদ্যোক্তারাই কৃষকের বা বাড়িতে বা মাঠে পৌঁছে যান।
নীলফামারীর চিলাহাটিতে স্থানীয় উদ্যোক্তা বাপ্পি মিয়া জানান, তিন বছর আগে তিনজনে মিলে তিন লাখ টাকা দিয়ে একটি মাড়াইযন্ত্র কিনেছিলেন। প্রতি বিঘা জমির ধান মাড়াইয়ে তাঁরা ৫০০ টাকা নেন। মৌসুমে মাসে ৬০ হাজার টাকার বেশি আয় হয় বলে জানান তিনি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে কৃষিযন্ত্রের বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার যন্ত্র দেশে তৈরি হয়। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এএমএমএ-বি-এর সভাপতি আলিমুল আহসান চৌধুরী বলেন, এবার হাওরে ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিযন্ত্রের বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে। অনেকে অর্ডার করেও যন্ত্র নেননি। তাঁর মতে, কৃষিযন্ত্রের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। তবে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে দেশে কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ব্য�়বহুল রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদের হার ৭ থেকে ১৪ শতাংশে উঠে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি এসব সমস্যার সমাধান চান।
উত্তরণের আরেক বড় চ্যালেঞ্জ বিক্রির অর্থ আদায়। বাজারে ইতিমধ্যে পাঁচ কোটি টাকার বেশি পাওনা আটকে গেছে। পরিচালক অমিতাভ পাল বলেন, কৃষকদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা গেলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বাকিতে যন্ত্র বিক্রি করতে হতো না। এতে কৃষকের যন্ত্র বেচাকেনা সহজ হতো, একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থের জোগান পেত।
দেশি কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বাড়লেও তা তৈরির দক্ষ কর্মীর সংকট কাটছে না। বিশেষ করে আধুনিক মেশিন পরিচালনায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রকট। এ কারণে উত্তরণ একটি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। অমিতাভ পাল জানান, ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে তাঁরা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি লেজার কাটিং মেশিন বসিয়েছেন। এই মেশিনে স্টিলের পাত নিখুঁতভাবে কাটা যায়, ফলে উৎপাদনের মান ও গতি দুটোই বাড়ে। কিন্তু সেটি চালানোর মতো দক্ষ কর্মী পেতে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লেগেছে তাঁদের। স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উদ্যোক্তারা কাঁচামালের শুল্ক ও ঋণের সুদ মওকুফ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং যন্ত্র কেনায় কৃষকদের অর্থায়নে নীতিসহায়তা দাবি করেন।




