দেশের অন্যান্য উপজেলা বা গ্রামীণ বাজার যখন ভোরের আলোয় নতুন কর্মব্যস্ততায় জাগে, তখন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার রেলবাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোরের আলো এখানে নতুন শুরুর ইঙ্গিত দেয় না; বরং রাতের অবিরাম বাণিজ্যিক তৎপরতারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। শহরটি আসলে কখনো ঘুমায় না—দিন-রাত সমান তালে চলে প্রাচীন বাজারের লেনদেন। সম্প্রতি টানা এক সপ্তাহ সৈয়দপুর রেলবাজার ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয় দপ্তরের নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, চার লাখের বেশি মানুষের এই নগরীতে বাংলা ও উর্দু ভাষার এক মেলবন্ধন লক্ষণীয়। নামে উপজেলা হলেও নাগরিক সুবিধা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্যে এটি দেশের বড় শহরগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেয়। ১৮৭০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে এখানে বিশাল রেলওয়ে কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে আধুনিক নগরায়ণের ভিত্তি পড়ে; বর্তমানে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
‘সাইয়্যেদপুর’ থেকে সৈয়দপুর নামের উৎপত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুদূর অতীতে ভারতের কোচবিহার থেকে আসা একটি সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবার এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ইসলাম প্রচারের কারণে তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় অঞ্চলটির নাম হয় ‘সাইয়্যেদপুর’, যা কালক্রমে ‘সৈয়দপুর’ রূপ নেয়। রংপুর জেলা গেজেট অনুযায়ী, ১৮৭০ সালের আগে এটি ছিল রংপুর জেলার দারোয়ানি থানার একটি সাধারণ বাজার। নীলফামারী মহকুমা গঠনের পর ১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত এটি নীলফামারী সদর থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। জনসংখ্যা ও শিল্পের বিকাশ দেখে ১৯১৫ সালে সৈয়দপুরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ থানা এবং ১৯৫৮ সালে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়।
শহরের ইতিহাস ও অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে সুবিশাল রেলওয়ে কারখানা। ১৮৭০ সালে প্রায় ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই কারখানায় কাজের জন্য বিহার, যুক্ত প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার উর্দুভাষী শ্রমিক আনা হয়। দেশ ভাগের পর অনেকেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে, ফলে শহরে অবাঙালিদের বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে। কারখানায় ট্রেন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি একসময় কোচ ও ওয়াগন উৎপাদন হতো। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে দিয়ে মানুষ ও পণ্যের চলাচল বাড়ার সঙ্গে বাজার সম্প্রসারিত হয়। বাঙালি, বিহারি ও মাড়োয়ারিদের সহাবস্থানে শহরটি এক অনন্য কসমোপলিটন চরিত্র লাভ করে।
সৈয়দপুরকে ‘রাতের শহর’ বলার কারণও এই রেলওয়ে কারখানা। ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে কাজ চলত, ফলে শ্রমিকদের চাহিদা মেটাতে দোকানপাট ও রেস্তোরাঁগুলো গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকত। কালক্রমে এটি শহরের সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। অন্যান্য শহর সন্ধ্যার পর নিস্তব্ধ হলেও সৈয়দপুরে তখন দ্বিতীয় পর্বের সক্রিয়তা শুরু হয়। যদিও সড়কপথের উন্নয়নে রাতের ট্রেনের ওপর নির্ভরতা কমেছে, তবুও পৌর বাজার ও রেলওয়ে বাজার এলাকায় এখনো প্রায় সারা রাত বেচাকেনা চলে। গভীর রাতে রিকশার শব্দ, পাইকারি ব্যবসায়ীদের কোলাহল আর রেস্তোরাঁয় মানুষের ভিড় চোখে পড়ে।
প্রাচীন বাণিজ্যের পাশাপাশি শহরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপ্লব এসেছে ঝুট বা পরিত্যক্ত কাপড়ের ব্যবসায়। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও চট্টগ্রামের পোশাক কারখানা থেকে বাতিল হওয়া ঝুট কাপড় কিনে এখানকার উদ্যোক্তারা স্থানীয় কারখানায় তৈরি করেন আন্তর্জাতিক মানের ট্রাউজার, জ্যাকেট ও ডেনিম প্যান্ট। এই শিল্প স্থানীয় অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে সৈয়দপুরের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে; এটি এখন উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে স্বনির্ভর ও গতিশীল অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস।
কৃষিজাত উৎপাদনও শহরের বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখে। পাট, গম ও আলু চাষের উপযোগী মাটিতে প্রচুর ফসল হয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই রেলপথের সুবিধায় পাট কলকাতা ও দেশের বিভিন্ন জুট মিলে পাঠানো হতো। এখনো রেলবাজারের গদিঘরগুলোয় কোটি টাকার পাটের বেচাকেনা হয়। আলুর বিপুল আবাদের জন্য এখানে তিনটি হিমাগার রয়েছে। প্রায় ৫০টি চালের কলের মধ্যে ৫টি অটো রাইস মিল; এসব মিল থেকে প্রতিদিন শত শত টন চাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। এছাড়া ১৫টি আটা-ময়দার মিল ও ৭টি তেলের মিল আশপাশের জেলার চাহিদা মেটায়।
খাদ্যসংস্কৃতিতেও সৈয়দপুর অনন্য। বাঙালি ও উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে দারুণ সব পদ। শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ‘বট-পুরি’—গরু বা মহিষের ভুঁড়ি দিয়ে তৈরি এই খাবারের চাহিদা এত বেশি যে অনেক সময় অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করতে হয়। পানহাটির গোলজার হোটেল, ভোলার হোটেল ও জিআরপি ক্যানটিনে বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মানুষ ভিড় জমান। সন্ধ্যার পর শহরের বাতাস কাবাব ও চাপের সুবাসে ম-ম করে; আল-শামস হোটেলের গরুর চাপ ও ফুলকো লুচির দেশজুড়ে সুনাম আছে। রেলগুমটি মোড়ে স্ট্রিট ফুডের দোকানে শিক কাবাব, জালি কাবাব ও চিকেন ফ্রাই পাওয়া যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, দিনের চেয়ে রাতের ব্যবসাই এখানে বেশি—রাত বাড়লে কাবাবের উনুন আরও জ্বলে ওঠে এবং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ গাড়ি নিয়ে আসেন মাঝরাতে। তাজির হোটেলের মোরগ পোলাও, সুগন্ধি বিরিয়ানি ও ১২টির বেশি বেকারির পণ্যও জনপ্রিয়।
সংস্কৃতির দিক থেকে সৈয়দপুর তথা নীলফামারী জেলার লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ। ভাওয়াইয়া গান এ অঞ্চলের প্রধান অনুষঙ্গ; এছাড়া সারি গান যেমন ‘নয়নশরি বোস্তাম বাউদিয়া’, ‘শীতল শরি জনকপালা’ প্রভৃতি আজও জনপ্রিয়। গ্রামীণ প্রথার মধ্যে ‘পাস্তি’, ‘অষ্ট মঙ্গলা’, ‘ভাদর কাটানি’ ও ‘পৌষ কাটানি’ উল্লেখযোগ্য। স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে ১৮৬৩ সালে নির্মিত ‘চিনি মসজিদ’ চুন, সুরকি ও কলকাতা থেকে আনা মর্মর পাথর দিয়ে নির্মিত, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ব্রিটিশ আমলের নট সেটেলমেন্ট, ফিদা আলী ইনস্টিটিউট ও মর্তুজা ইনস্টিটিউট শহরের অতীত গৌরবের সাক্ষী। সব মিলিয়ে সৈয়দপুর একটি জীবন্ত, স্পন্দিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ কসমোপলিটন শহর—যেখানে কৃষি, শিল্প ও সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রেলবাজারের প্রাচীন ব্যবসার ঐতিহ্য।




