দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অনেকেই বইয়ের পাতায় সময় কাটাতে পছন্দ করেন। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, বই পড়া কেবল একটি শখ নয়, বরং এটি মস্তিস্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, আনন্দদায়ক গল্প বা উপন্যাসের পাঠ মানুষের জ্ঞানীয় ক্ষমতা বা বুদ্ধিমত্তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং বার্ধক্যে মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ করতে সহায়তা করে। বর্তমান সময়ে অনেকে মনে করেন ডিজিটাল স্ক্রিনের নোটিফিকেশন দেখালেই মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়, তবে এটি একটি ভুল ধারণা। এর পরিবর্তে কাগজের বই পড়লে শরীরের কর্টিসল বা মানসিক চাপের হরমোনের মাত্রা হ্রাস পায়, যা সারাদিন মন প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করে।
‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস’-এর এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বই পড়ার অভ্যাস নিঃসঙ্গতা দূর করতে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধিতে জাদুকরী ভূমিকা রাখে। জীবনযাপন বিষয়ক পোর্টাল ‘রিয়াল সিম্পল’-এ মার্কিন গবেষক লিসা মিলব্র্যান্ড বই পড়ার মনস্তাত্ত্বিক সুফলগুলো আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, শৈশব থেকে বই পড়ার অভ্যাস থাকলে মস্তিষ্কের ভাষা, আবেগ এবং জ্ঞান নিয়ন্ত্রণের বিশেষ অংশগুলো প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠ প্রবীণ বয়সে আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। সপ্তাহে অন্তত একবার বই পড়লে দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিভ্রম বা ‘কগনিটিভ ডিক্লাইন’ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় বই পড়ার ক্ষমতা অনেকটা ওষুধের মতো। কেমব্রিজের ১০ হাজার কিশোর-কিশোরীর ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত পাঠকদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক কম। এমনকি বিশ্রাম বা ঘুমের চেয়েও দ্রুত স্নায়ু শান্ত করতে পারে বই। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র উদ্বেগের মুহূর্তে মাত্র ৬ মিনিট বই পড়লে মানসিক চাপ প্রায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বই পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহমর্মিতা বৃদ্ধি। কোনো উপন্যাসের চরিত্রের আবেগ ও জীবনসংগ্রামের সাথে যখন পাঠক নিজেকে মেলাতে পারেন, তখন মস্তিষ্কের ‘মিরর নিউরন’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই বিশেষ স্নায়ুকোষগুলো অন্যের অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে। সমীক্ষা অনুযায়ী, সপ্তাহে মাত্র ৩০ মিনিট বই পড়লে বাস্তব জীবনে সহমর্মিতার অনুভূতি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের প্রতি সহনশীলতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়।
সামাজিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার পাঠক জানিয়েছেন যে নিয়মিত বই পড়ার ফলে তারা বাস্তব জীবনে সাহসী ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বইয়ের চরিত্রের অনুপ্রেরণায় অনেকে নতুন ক্যারিয়ার গড়া, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক ত্যাগ করা বা স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি, তরুণ প্রজন্মের একাকীত্ব দূর করতে বই কাজ করে সুরক্ষাকবচ হিসেবে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৫৯ শতাংশ তরুণ জানান, পড়ার সময় তারা অন্যদের সাথে আত্মিক সংযোগ অনুভব করেন এবং ৫৬ শতাংশের মতে এটি তাদের নিঃসঙ্গতার দুঃখ দূর করে। এছাড়া ‘বুক ক্লাব’ বা যৌথ পাঠচক্রের মাধ্যমে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে মস্তিস্ককে শান্ত রাখা সম্ভব।




