রাজধানী ঢাকায় দ্রুত নগরায়ণের ফলে গত এক দশকে সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে মোট আয়তনের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে। অর্থাৎ, এই সময়ে সবুজ এলাকা ৩ হাজার ৭৮৪ দশমিক ১৯ হেক্টর থেকে কমে ২ হাজার ৬০৮ দশমিক ৯৯ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনটি গত অগাস্টে প্রকাশ করা হয় এবং এতে ভূমি ব্যবহার ও আচ্ছাদনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, নির্মাণ এলাকার দ্রুত সম্প্রসারণের বিপরীতে জলাশয়, গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা এবং পতিত জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তার মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি এবং নগর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যমান জলাশয় ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং নতুন উন্মুক্ত স্থান সৃষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ঢাকার সবুজ আচ্ছাদনের অবনতির এই চিত্র নতুন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক সফি উল্লাহ ও শিক্ষার্থী ইসমত ইনানের ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯১ সালে ঢাকা মহানগরে গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা ছিল ৫ হাজার ৮০০ দশমিক ৬৪ হেক্টর, যা ২০১৬ সালে নেমে আসে ৩ হাজার ৮০০ দশমিক ১৬ হেক্টরে। বর্তমানে অধ্যাপক সফি উল্লাহ বলেন, পূর্ব ঢাকার নিচু এলাকায় কিছু সবুজ এখনো টিকে আছে, কিন্তু একসময় যে জলাশয় ও খোলা জায়গা ছিল, সেগুলো এখন কংক্রিটের ভবনে পরিণত হয়েছে। তিনি রোড ডিভাইডারের গাছ ও আবাসিক এলাকার সীমিত সবুজ ছাড়া আর কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এম শফিক-উর রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবছরই সবুজ ও জলাভূমির পরিমাণ কমছে, বিশেষ করে গত ১০-১৫ বছরে এই হ্রাস আরও তীব্র হয়েছে। ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভবন নির্মাণ বেড়েছে, ফলে বড় শহরগুলোতে কংক্রিটের পরিমাণ বেশি। তার মতে, রাস্তার পাশে, সড়ক বিভাজকে এবং নদীর পাড়ে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো জরুরি, যা তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, এ বছর প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত ২ কোটি ৮২ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জন্য একটি সেল গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিটি গাছের তথ্য সংরক্ষণে ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের মতে, বৃক্ষরোপণ হতে হবে ‘রাইট গ্রিনিং’, যা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে। তিনি বলেন, ছাদবাগান এবং পরিকল্পিত নগর সবুজায়নের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। অধ্যাপক শফিক-উর রহমান সময় ও স্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বর্ষাকালই গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়, এবং এমন জায়গা বেছে নিতে হবে যেখানে গাছটি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে।
গাছের বেঁচে থাকার হিসাব না রাখার সমালোচনা করে ক্যাপসের চেয়ারম্যান বলেন, কতগুলো গাছ আসলে টিকে আছে তার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ঢাকা শহরে আদর্শভাবে ২০-২৫ শতাংশ গাছ আচ্ছাদিত এলাকা থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে তা অর্ধেকেরও কম। তাই বিদ্যমান সবুজ ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং নতুন সবুজ স্থান সৃষ্টির মাধ্যমে টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।




