বর্তমান যুগ এক অসাধারণ সময়ে উপনীত হয়েছে, যেখানে আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি বাজার এবং মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি এবং মহাদেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহারের ফলে দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে গেছে, যা আমাদের সৃজনশীল হতে এবং বড় পরিসরে চিন্তা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে একে একটি 'সুবর্ণ যুগ' বলা যেতে পারে। তবে এই দ্রুত অগ্রগতির মাঝে আমরা কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি—অর্থাৎ 'বিশ্বাস'—কে ভুলে যাচ্ছি?
প্রযুক্তি আমাদের কাছাকাছি আনলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি গভীর মানবিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া এখন সহজ এবং সাশ্রয়ী, কিন্তু এর ফলে আমরা দৈনন্দিন জীবনের সেই তাৎক্ষণিক মুহূর্তগুলো হারিয়ে ফেলছি। যেমন—লিফটে কারো সাথে বন্ধুসুলভ আলাপ কিংবা মিটিংয়ের আগে কফি খেতে খেতে পারস্পরিক আগ্রহের বিষয়ে কথা বলা; এগুলো কেবল সাধারণ আলাপ নয়, বরং অনেক বেশি অর্থবহ। করিডোরে হঠাৎ দেখা হওয়া বা তাৎক্ষণিক ফিডব্যাক দেওয়া অনেক বেশি প্রভাবশালী হতে পারে, যা এআই-এর মাধ্যমে সম্ভব নয়। এআই আমাদের দিনগুলোকে দক্ষ করলেও এটি বিশ্বাস এবং সত্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এআই-এর কাছে পরামর্শ চাওয়ার ফলে আমরা হয়তো সহকর্মীর কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া বা কোনো কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগটি হারিয়ে ফেলছি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শক্তিশালী স্টেকহোল্ডার সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা ব্যবসায়িক ফলাফলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। এই সম্পর্কগুলো মূলত দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতার মাধ্যমে দৃঢ় হয়। ২০২৬ সালের এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটার অনুযায়ী, অনেক দূরবর্তী প্রতিষ্ঠান এবং নেতাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমলেও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক, সহকর্মী এবং নিয়োগকর্তাদের প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে। অর্থাৎ, বিশ্বাস এখন আরও ঘনিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে গড়ে উঠছে। দলের মধ্যে বিশ্বাস থাকলে মানুষ স্পষ্টভাবে কথা বলে এবং ভিন্নমত পোষণ করতে পারে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করে। আগামী বছরগুলোতে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই সফল হবে, যারা দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষ এবং সম্পর্কের পেছনে বিনিয়োগ করবে। প্রযুক্তি কাজ করার ধরন বদলে দিচ্ছে, তবে বিশ্বাসই নির্ধারণ করবে আমরা কতটা সফল হব।
এই প্রেক্ষাপটে ডেন্টনস-এর সিইও কিছু কার্যকর পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, অর্থবহ মানবিক সংযোগে বিনিয়োগ করতে হবে। মহামারীর সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে নেতারা লেনদেনের বাইরে গিয়ে দলের সদস্যদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজেও তার ক্যালেন্ডারে 'গ্র্যাটিটিউড আওয়ার' বা কৃতজ্ঞতার সময় বরাদ্দ রাখেন, যেখানে তিনি ভালো কাজের জন্য সহকর্মীদের প্রশংসাপত্র পাঠান, যা কর্মীদের মূল্যবান মনে করায় এবং বিশ্বাস বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, বড় প্রতিষ্ঠানকেও ছোট করে অনুভব করানো প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের আকার যত বড় হবে, বিভিন্ন টিমের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করা তত জরুরি। গ্রাহকদের সাফল্যের লক্ষ্য সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী কমিউনিটি তৈরি করলে সহযোগিতা সহজ হয় এবং বিশ্বাস জন্মায়। তৃতীয়ত, শোনার মাধ্যমে নেতৃত্ব দেওয়া। কেবল আনুষ্ঠানিক সভা নয়, বরং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তরুণ সদস্যদের সাথে বসে তাদের কথা শোনা এবং গ্রাহকদের প্রয়োজন গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। চতুর্থত, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করা এবং আচরণের প্রেডিক্টেবিলিটি বজায় রাখলে বিশ্বাস তৈরি হয়। সেবার মান এবং সহযোগিতায় ধারাবাহিকতা থাকলে তা বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়, অন্যথায় তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। পরিশেষে, ব্যবসায়িক নেতারা গতি, স্কেল এবং দক্ষতার পেছনে ছুটলেও মনে রাখতে হবে যে বিশ্বাসকে অটোমেটেড করা বা ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়; এটি অর্জিত হয় কেবল ধারাবাহিক কাজ এবং প্রকৃত মানবিক সম্পর্কের মাধ্যমে।




