ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিজিটাল রূপান্তরকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও এর বাস্তব কার্যকারিতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ। বৃহস্পতিবার ঢাকার আর্মি গলফ ক্লাবে আয়োজিত ‘ট্রেড উইথ টিসিবি’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শুধু ডিজিটাল সিস্টেম চালু করলেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না; বরং পণ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় কোনো চাঁদাবাজি হচ্ছে কি না এবং ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন কি না, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া প্রকৃত দরিদ্র মানুষরা সঠিক সময়ে পণ্য পাচ্ছেন কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করার তাগিদ দেন তিনি।

নাজনীন আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়াতে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজিটাল কার্ডের কার্যকারিতা কেবল অংশীজনদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সরাসরি ভোক্তাদের কাছ থেকে জেনে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি টিসিবির কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়ে আরও নতুন পণ্য অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন, যাতে অর্থনৈতিক ধাক্কায় যারা দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি রয়েছেন, তারাও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আসতে পারেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অধ্যাপক বদরুন নেসা আহমেদ একটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজিটাল কার্ড চালুর ফলে পুরো বিক্রয় প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হয়েছে। ডিলারদের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ জমা এবং নিজস্ব গুদাম ব্যবস্থাপনার উন্নতির ফলে বছরে মোট ৮০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে, যার মধ্যে ডিলার পর্যায়ে সাশ্রয় ৬০ কোটি এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় ২০ কোটি টাকা। টিসিবি এখন ভর্তুকির চাপ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তথ্যভান্ডারের আপডেট অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই করে ৭৯ লাখ ৯০ হাজার প্রকৃত সুবিধাভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৭৩ লাখ ৭ হাজার স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনআইডি ও ই-কেওয়াইসি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ লাখ ভুয়া ও অযোগ্য আবেদন বাতিল করা হয়েছে। আর্থিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ঋণের সুদ বাবদ যে ৫৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কমে ১০৬ কোটি টাকায় নামতে পারে।

চলতি অর্থবছরে টিসিবির ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সময়ে বিক্রয় রাজস্ব ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি এবং প্রতি সুবিধাভোগীর ভর্তুকি ১৭ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে আটা, লবণ, চা, ডিটারজেন্ট, সাবান ও মসলার মতো পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকসেবায় ‘উপকারী’ নামক স্মার্ট অ্যাপ চালু করা হয়েছে এবং শতভাগ ই-জিপি ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাজারদর পর্যবেক্ষণ এবং স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ জানান, ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে বিল পরিশোধের সময় কমে তিন থেকে সাত দিনে নেমে এসেছে। তিনি টিসিবির মাধ্যমে নারীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগের কথা বলেন। টিকে গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার এবং এমসিজি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্ক শ্যান গোল্ডরিক টিসিবির ডিজিটাল দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়নের প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির; বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মাহবুব ও বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান।