বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট বরাবরই বিমা, রেলপথ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো স্থিতিশীল ও প্রথাগত ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য পরিচিত। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে এই কৌশলের মাধ্যমেই তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন। সম্প্রতি ৯৬ বছর বয়সী বাফেট চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বর্তমান জোয়ারে তাঁর বিনিয়োগ নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। তিনি সবসময় যে ব্যবসা বোঝেন, সেখানেই বিনিয়োগ করার মূলনীতিতে অটল থেকেছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বার্কশায়ার এআই থেকে দূরে আছে। অ্যাপল এবং অ্যালফাবেটের মতো টেক জায়ান্টদের মাধ্যমে তারা সরাসরি এই খাতের সাথে যুক্ত। ২০১৬ সালে অ্যাপলকে একটি টেকসই ভোক্তা পণ্যভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করে বিনিয়োগ শুরু করেন বাফেট। সম্প্রতি জুনে অ্যালফাবেটে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও, এটি গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের জন্য নয়, বরং সরাসরি এআই খাতের লক্ষ্য করে করা হয়েছে, যা তাঁর আগের কৌশলের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।
তবে বাফেটের প্রকৃত সাফল্য লুকিয়ে আছে এআই-এর পরিকাঠামো বা অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগে। এআই সিস্টেম এবং বিশাল ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ২০০০ সালে বার্কশায়ার 'মিডআমেরিকান এনার্জি' কিনেছিল, যা আইওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। যদিও তখন এআই-এর কথা চিন্তা করা হয়নি, কিন্তু বর্তমানে আইওয়া ডেটা সেন্টারের একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় এই বিনিয়োগ আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। বার্কশায়ারের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ অ্যাবেল জানিয়েছেন, গত বছর আইওয়ায় তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৮ শতাংশই এসেছে ডেটা সেন্টার থেকে। এছাড়া নেভাদার ইউটিলিটি কোম্পানি 'এনভি এনার্জিও' বার্কশায়ারের মালিকানায় রয়েছে, যেখানে ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার ঘটছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি যন্ত্রাংশ তৈরির খাতেও বাফেটের বাজিমাত হয়েছে। ২০১৬ সালে তিনি 'প্রিসিশন কাস্টপার্টস' নামক একটি কোম্পানি কেনেন, যা টারবাইনের যন্ত্রাংশ তৈরি করে। যদিও সে সময় এই কোম্পানিটি কিনতে বাফেট বাজারমূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছিলেন, তবে এখন গ্যাসচালিত টারবাইনের চাহিদা বাড়ায় তা অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম প্যাট্টির মতে, ডেটা সেন্টার নির্মাণে টারবাইন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান, যা প্রিসিশন কাস্টপার্টস উৎপাদন করে।
মাহোনি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কেন মাহোনি মনে করেন, অর্থনীতির মৌলিক প্রয়োজন অর্থাৎ জ্বালানি ও ইউটিলিটি খাতের মালিকানা আগে থেকেই থাকায় বাফেট এই পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পেরেছেন। সিএফআরএ রিসার্চের পরিচালক ক্যাথি সিফার্ট বিষয়টিকে বাফেটের কোম্পানি নির্বাচনের দক্ষতা এবং কিছুটা সৌভাগ্যের সংমিশ্রণ হিসেবে দেখছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি বাফেটের পরোপকারী সত্তাও অনন্য। বর্তমানে তিনি বার্কশায়ারের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস। ফোর্বসের তথ্যমতে, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১৪৪.৬ বিলিয়ন ডলার। তিনি তাঁর সম্পদের ৯৯ শতাংশ দান করার অঙ্গীকার করেছেন, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ৭২ বিলিয়ন ডলার গেটস ফাউন্ডেশন এবং তাঁর সন্তানদের পরিচালিত দাতব্য সংস্থায় প্রদান করা হয়েছে। ২০১০ সালে তিনি বিল ও মেলিন্ডা গেটসের সাথে মিলে 'গিভিং প্লেজ' উদ্যোগের সূচনা করেন, যার লক্ষ্য ধনীদের সম্পদের অন্তত অর্ধেক মানবকল্যাণে ব্যয় করতে উৎসাহিত করা।




