সাধারণত বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় আফ্রিকা মহাদেশটি পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে সামান্য হেলে আছে এবং আকারে খুব একটা বড় নয়। তবে ভূগোলের প্রকৃত তথ্য এবং মানচিত্রের প্রদর্শনের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আফ্রিকা পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ যা উত্তর ও দক্ষিণ এবং পূর্ব ও পশ্চিম—এই চারটি গোলার্ধেই বিস্তৃত। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ ভাগকারী নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা আফ্রিকার বুক চিরে চলে গেছে, যার ফলে এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উত্তর গোলার্ধে এবং বাকি অংশ দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থান করে। একইভাবে, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রধান মধ্যরেখা বা জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমারেখা আলজেরিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, টোগো এবং ঘানার ওপর দিয়ে যাওয়ায় মহাদেশটি পূর্ব ও পশ্চিম উভয় গোলার্ধেও জায়গা করে নিয়েছে।

আফ্রিকার প্রকৃত বিশালতা বুঝতে হলে এর আয়তনের দিকে তাকাতে হবে। প্রায় তিন কোটি চার লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই মহাদেশটি এশিয়ার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর বিশালত্বের একটি উদাহরণ দিতে গেলে বলা যায়, আফ্রিকার ভেতরে আস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং ইউরোপ মহাদেশের একটি বড় অংশ অনায়াসেই জায়গা করে নিতে পারে। সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীর হিসেবে, এই সবকটি দেশ একত্রিত করলেও তা আফ্রিকার মোট আয়তনের চেয়ে ছোট হবে।

তাহলে প্রশ্ন জাগে, মানচিত্রে একে ছোট দেখায় কেন? এর মূল কারণ হলো 'ম্যাপ প্রজেকশন'। পৃথিবী যেহেতু গোলক এবং কাগজ চ্যাপ্টা, তাই একটি গোল বস্তুকে সমতলে রূপান্তর করতে হলে তার আকার বিকৃত করতে হয়। ১৫৬৯ সালে জেরারডাস মার্কেটর নাবিকদের সুবিধার্থে 'মার্কেটর প্রজেকশন' পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। এই পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি মেরু অঞ্চলের দেশগুলোকে অনেক বেশি বড় করে দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমান মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। একইভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উত্তরের দেশগুলোকেও তাদের আসল আকারের চেয়ে বড় দেখায়। অন্যদিকে, বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকায় আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশ মানচিত্রে তুলনামূলক ছোট দেখায়।

এই ভুল ধারণা দূর করতে ২০১০ সালে জার্মান কম্পিউটার গ্রাফিক ডিজাইনার কাই ক্রাউজ 'দ্য ট্রু সাইজ অব আফ্রিকা' নামক একটি গ্রাফিক তৈরি করেন। সেখানে তিনি আফ্রিকার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোকে বসিয়ে দেখান, যা ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং মানুষকে মানচিত্রের এই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতন করে। মূলত কাগজের সীমাবদ্ধতার কারণে মানচিত্রকারদের আকার, দূরত্ব বা দিকের যেকোনো একটিকে বিকৃত করতে হয়, যার ফলে আফ্রিকার প্রকৃত রূপ মানচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি বিশাল হয়ে থাকে।