বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষার প্রচেষ্টা ও তার কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সাম্প্রতিক সূচকে অত্যন্ত হতাশাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা এজেন্সি (ইপিআই)-এর প্রকাশিত ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)’ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। এই গবেষণাপত্রটি কলম্বিয়া এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমসিকল ম্যাকবেইন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় প্রস্তুত করেছেন।
সূচকটিতে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর মাত্র ২৩.৪৬। এই তথ্যের সহজ অর্থ হলো, পরিবেশ রক্ষায় একটি আদর্শ দেশের যে ন্যূনতম প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, বাংলাদেশ তার ২৫ শতাংশেরও কম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্র—পরিবেশগত স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রতিবেশব্যবস্থার সচলতার ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই মূল ক্ষেত্রগুলোর অধীনে বায়ু ও পানির মান, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মতো মোট ৪৭টি নির্দেশক যাচাই করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ অধিকাংশ দেশের পেছনেই রয়েছে। এই অঞ্চলের আটটি দেশের মধ্যে কেবল ভারত ব্যতীত বাকি সব দেশই পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভুটান (৫২তম, স্কোর ৪৭.৭৪), এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৯৪তম)। এছাড়া নেপাল ১২৮তম, আফগানিস্তান ১৩৫তম, পাকিস্তান ১৫৭তম এবং মালদ্বীপ ১৭১তম স্থানে রয়েছে। তালিকায় সর্বশেষে অবস্থান করছে ভারত, যার স্থান ১৭৬তম এবং স্কোর ২২.৪৬।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, পরিবেশ সুরক্ষায় শীর্ষ ১০টি দেশের অধিকাংশেরই অবস্থান ইউরোপে। এস্তোনিয়া (স্কোর ৭৪.৭৯) প্রথম স্থানে থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান যথাক্রমে লুক্সেমবার্গ ও যুক্তরাজ্যের দখলে। এছাড়া ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন ও অস্ট্রিয়া প্রথম দশকের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে খারাপ পাঁচটি দেশের তালিকায় লাওস (১৭৭তম), ভারত (১৭৬তম), বাংলাদেশ (১৭৫তম), মালি (১৭৪তম) ও ভিয়েতনাম (১৭৩তম) রয়েছে। বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৭তম এবং চীনের অবস্থান ১২৯তম।
বাংলাদেশের এই নিম্ন অবস্থানের পেছনে বিশেষজ্ঞরা অপরিকল্পিত নগরায়ন, প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন। বিশেষ করে পরিবেশ আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা এই অবনতির প্রধান কারণ। পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর সদস্যসচিব এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল এই মূল্যায়নের যথার্থতা স্বীকার করে বলেন, দেশের মাটি, পানি ও বাতাস এখন মারাত্মকভাবে দূষিত এবং কোনো নদীই এখন দূষণমুক্ত নয়। তিনি মনে করেন, সমীক্ষাহীন শিল্পায়নের ফলে মানুষ চরম মূল্য দিচ্ছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব প্রতিফলন নেই এবং দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে বিপরীতমুখী মনে করার ভ্রান্ত ধারণা দূর করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।




