ইসলাম ধর্মে দোয়াকে ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। মুমিন বান্দার প্রার্থনা আল্লাহ-তাআলা কবুল করেন, তবে এই কবুলিয়তের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও আদব মেনে চলা আবশ্যক। কিছু বিশেষ কাজ ও মানসিকতা দোয়ার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং কবুল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মূলত ছয়টি প্রধান কারণে দোয়া কবুল হয় না বলে মুহাদ্দিসদের বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথমত, হারাম উপার্জন ও খাদ্যের প্রভাব। দোয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অবৈধ উপার্জিত অর্থ এবং হারাম খাদ্য। মানুষের জীবনযাপন, পোশাক ও খাদ্যের সঙ্গে তার ইবাদতের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরের পর ধুলোমলিন অবস্থায় অত্যন্ত আকুল হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় এবং পোশাক সবই হারাম। এমন অবস্থায় তার দোয়া কবুল হওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রার্থনার আগে উপার্জনের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, একনিষ্ঠতার অভাব। বান্দার অন্তরে যখন আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা থাকে না, তখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। পবিত্র কুরআনের সুরা মুমিন ও সুরা বাইয়্যিনাহ-তে একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহকে ডাকার এবং তাঁর ইবাদতে একনিষ্ঠ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু দোয়া নিজেও একটি ইবাদত, তাই এতে আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতা অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, পাপের প্রার্থনা করা। দোয়াকে কেবল কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, একে অন্যায়ের হাতিয়ার বানানো যাবে না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বা কোনো পাপ কাজ সংঘটনের উদ্দেশ্যে দোয়া করলে তা কবুল হয় না। বুখারি শরীফের হাদিস অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি পাপ বা আত্মীয়তার বন্ধন নষ্ট করার দোয়া না করে, ততক্ষণ তার দোয়া কবুল হতে থাকে। অর্থাৎ শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করা যাবে না।

চতুর্থত, উদাসীন হৃদয়ে প্রার্থনা। দোয়া কেবল ঠোঁটের উচ্চারণ নয়, বরং অন্তরের নিবেদন। বিনীতভাবে ও গোপনে প্রতিপালককে ডাকার কথা বলা হয়েছে সুরা আরাফ-এ। সুনানে তিরমিজির হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ অমনোযোগী বা উদাসীন হৃদয়ের প্রার্থনা কবুল করেন না। প্রার্থনাকারীর মনে যত বেশি বিনয় এবং আল্লাহর ক্ষমতার ওপর আস্থা থাকবে, দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।

পঞ্চমত, তাড়াহুড়া করে হতাশ হওয়া। দোয়া করার পর দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করা ভুল। আল্লাহ তাঁর হিকমত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে আবেদন পূরণ করেন। সহিহ বুখারি অনুযায়ী, অনেকে তাড়াহুড়া করে বলেন যে তারা দোয়া করেছেন কিন্তু কবুল হয়নি—এই মানসিকতা দোয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়া কিংবা অদৃশ্য কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া—উভয়ই দোয়ার ফল হতে পারে। তাই বিলম্বিত হওয়া মানেই প্রত্যাখ্যাত হওয়া নয়।

ষষ্ঠত, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ পরিত্যাগ করা। ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া মুমিনের দায়িত্ব। সুনানে তিরমিজির এক হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে যে, যারা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন এবং তখন তারা দোয়া করলেও তা কবুল হবে না। তাই নিজের সংশোধনের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।

পরিশেষে, দোয়া কবুল না হলে হতাশ না হয়ে একজন মুমিনের উচিত নিজের জীবন পর্যালোচনা করা এবং উপরোক্ত কারণগুলো সংশোধন করে আল্লাহর কাছে পুনরায় প্রার্থনা করা।