চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা অক্ষরজ্ঞানের সান্নিধ্য না পেয়েও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখনিঃসৃত বাণী বিশ্বজুড়ে সাহিত্য, আইন এবং দর্শনের ধারা বদলে দিয়েছে। আধুনিক পশ্চিমা প্রাচ্যবিদেরা প্রায়ই এই অলৌকিকতাকে অস্বীকার করে দাবি করেন যে, তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন অথবা ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে কোরআন রচনা করেছেন। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং কোরআনের ভাষাশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর রচয়িতা কোনো মানুষ হতে পারেন না।

নবীজির নিরক্ষরতা কোরআনের ঐশ্বরিক হওয়ার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। তিনি পড়তে বা লিখতে পারতেন না, যা পবিত্র কোরআনের সুরা আনকাবুতের ৪৮ নম্বর আয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কার সামাজিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উন্মুক্ত; তিনি যদি গোপনে কোনো পণ্ডিতের কাছে শিক্ষা নিতেন, তবে তৎকালীন কোরাইশরা তা সহজেই ধরে ফেলত। ৪০ বছর পর্যন্ত সততার জন্য 'আল-আমিন' উপাধিতে ভূষিত একজন ব্যক্তির হঠাৎ করে এমন উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রচনা করা তৎকালীন আরবের বিরোধীদের কাছেও অবিশ্বাস্য ছিল।

প্রাচ্যবিদরা প্রায়শই পাদ্রি বাহিরা বা ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের কথা উল্লেখ করে দাবি করেন যে, তাঁরা নবীজিকে শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তথ্যানুসারে, বারো বছর বয়সে পাদ্রি বাহিরার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যা থেকে একটি বিশাল গ্রন্থ মুখস্থ করা অসম্ভব। অন্যদিকে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল প্রথম ওহির সত্যতা স্বীকার করার অল্প সময় পরেই মৃত্যুবরণ করেন, ফলে তেইশ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে অবতীর্ণ কোরআনের শিক্ষক হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এছাড়া, কোরআনের ভাষাশৈলী এবং বাইবেলের ধর্মতাত্ত্বিক বর্ণনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাইবেলে অনেক নবীর ত্রুটি বর্ণিত হলেও কোরআন সকল নবীকে নিষ্পাপ ও মর্যাদাবান হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

কোরআনের নির্ভুল ভবিষ্যৎবাণীগুলো এর ঐশ্বরিক উৎসের জোরালো প্রমাণ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, পারস্যের কাছে রোমানদের শোচনীয় পরাজয়ের পর কোরআনে বলা হয়েছিল যে, তারা ৩ থেকে ৯ বছরের মধ্যে পুনরায় বিজয়ী হবে (সুরা রুম)। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে নাইনভে যুদ্ধে রোমানরা এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বিজয় লাভ করে। এছাড়া, ফেরাউনের মরদেহ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছিল (সুরা ইউনুস), যা আধুনিক যুগে মমি উদ্ধারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি হোদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কা বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণীও অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়।

পরিশেষে, কোরআন নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলেন না, বরং তাঁর প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়। সুরা নাজম এবং সুরা রহমানের আয়াত অনুযায়ী, মহান আল্লাহ-তাআলা তাঁর বিশ্বস্ত দূত জিবরিল (আ.)-এর মাধ্যমে তেইশ বছর ধরে ধাপে ধাপে নবীজির অন্তরে এই পবিত্র বাণী পৌঁছে দিয়েছেন।