বর্তমান সময়ের বিশ্বায়িত খাদ্যব্যবস্থা এবং কনফেকশনারি পণ্যে জিলাটিন একটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। চকোলেট, আইসক্রিম, জেলি, ক্যান্ডি, কেক ও দইয়ের পাশাপাশি প্রসাধনী সামগ্রী এবং ওষুধের ক্যাপসুলের খোলস তৈরিতেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে কোটি কোটি মুসলিম ভোক্তার কাছে জিলাটিনের উৎস নিয়ে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় উদ্বেগ রয়েছে। মূলত এটি কোন প্রাণী থেকে নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রাণীর জবাই পদ্ধতি ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক কি না, তা-ই এখানে মূল বিবেচ্য বিষয়।

রাসায়নিক ও খাদ্যবিজ্ঞানের ভাষায়, জিলাটিন হলো একটি বর্ণহীন ও গন্ধহীন প্রোটিন যৌগ। এটি মূলত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কিংবা শুকরের চামড়া, হাড়, ক্ষুর এবং কানেক্টিভ টিস্যু থেকে তাপ ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্কাশিত কোলাজেন প্রোটিন। যেহেতু এটি প্রাণিজ উৎস থেকে আসে, তাই এর ধর্মীয় বিধান নির্ভর করে মূল প্রাণীর পরিচয় এবং জবাই প্রক্রিয়ার ওপর।

ইসলামি শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রাথমিক সব খাদ্যই হালাল যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারা (আয়াত ১৬৮) এবং সুরা আনআম (আয়াত ১৪৫)-এ হালাল ও হারাম খাদ্যের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত এবং শুকরের মাংসকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া হিংস্র শ্বাপদ ও শিকারি নখযুক্ত পাখি এবং গৃহপালিত গাধার মাংস ভক্ষণ করাও নিষিদ্ধ।

এই নীতিমালার আলোকে জিলাটিনকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, উদ্ভিজ্জ বা কৃত্রিম জিলাটিন, যা স্টার্চ, পেকটিন বা সামুদ্রিক আগাছা থেকে তৈরি; এটি সম্পূর্ণ হালাল। দ্বিতীয়ত, হালাল প্রাণীর জিলাটিন; গরু বা ভেড়ার মতো পশুকে বিসমিল্লাহ বলে ইসলামি নিয়মে জবাই করা হলে তা থেকে প্রাপ্ত জিলাটিন বৈধ। তৃতীয়ত, শুকরজাত জিলাটিন; শুকর যেহেতু নাজিসুল আইন বা অপবিত্র, তাই এর থেকে তৈরি যেকোনো জিলাটিন সর্বাবস্থায় হারাম। চতুর্থত, অপবিত্র উপায়ে মৃত প্রাণীর জিলাটিন; হালাল প্রাণী হলেও তা যদি শ্বাসরোধ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট বা ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে মারা হয়, তবে তার জিলাটিন হারাম। তবে আহলে কিতাব বা খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের দ্বারা তাদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জবাই করা প্রাণীর ক্ষেত্রে কিছু অবকাশ থাকলেও আধুনিক স্বয়ংক্রিয় স্লটারহাউসের সন্দেহজনক প্রক্রিয়া পরিহার করাই তাকওয়ার দাবি।

জিলাটিনের রাসায়নিক রূপান্তর বা 'ইস্তিহালাহ' নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল এবং আইওএমএস-এর কিছু স্কলার মনে করেন, তীব্র তাপ ও এসিডের প্রক্রিয়ায় জিলাটিন নতুন বস্তুতে রূপান্তরিত হয়, তাই তা জায়েজ। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের হানাফি ফকিহ এবং সৌদি আরবের লাজনাহ দায়িমাহর মতো অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জিলাটিনে কোলাজেন প্রোটিনের সত্তাগত রূপান্তর ঘটে না। ফলে মূল উৎস হারাম হলে জিলাটিনও হারাম থাকে।

সন্দেহজনক খাদ্য পরিহার করার বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর হাদিসের কথা স্মরণ করে মুসলিম ভোক্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাজারে প্রক্রিয়াজাত পণ্য কেনার সময় উপাদানের তালিকায় কেবল 'জিলাটিন' লেখা থাকলে তা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। তবে 'হালাল বোভাইন জিলাটিন' অথবা 'ভেজিটেবল/ফিশ জিলাটিন' উল্লেখ থাকলে তা নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করা যাবে।